The social page

Saturday, June 06, 2020

June 06, 2020

স্বর্গ মিলে নারী মাঝে, সেই নারী কেন পণ্য সাজে

স্বর্গ মিলে নারী মাঝে, সেই নারী কেন পণ্য সাজে



অসীম সমুদ্রের প্রসস্থ প্রান্তর নীলিমাময়ী জোৎস্নার রঙের নীলাভ বর্ণের কোমল উপমার স্বর্গীয় মায়া হচ্ছে নারী। যার সুদীঘল বৈচিত্রময়ী পথের দিগন্ত সাজায় পুষ্প স্পর্শের আচড়ে, বর্নিল করে ধরনী, উন্মোচন করে শত ভয়াল থাবার নির্মম নির্যাতন। জীবন সুন্দরের অদৃশ্য ছোঁয়া বিকিরনের লাভা ছড়ায় প্রকৃতির বিন্দু প্রান্ত। তোমাকে ছাড়া কভু কেহ চিন্তা করে নাই সমাজ ঘরবাড়ী। নারী ছাড়া বিশ্বনগরী হতো না এতো বিচিত্রময়ী। নারী হচ্ছে একটা সংসার কারখানার প্রডাকশন ডিপার্টমেন্ট, তার হাতেই শ্রেষ্ঠত্ব তৈরির কারসাজি লুকায়িত থাকে। যেভাবে কারখানা উন্নয়ন প্রতিফলিত হয় সেভাবেই সমাজে দৃশ্যায়ন ঘটে। একটা পণ্যের গুনগত মান কত ভালো হবে তা কারখানা থেকেই থেকেই প্রস্তুত হয়ে আসে। সুদক্ষ কর্মীর দ্বারা সুদক্ষ সমাজই তৈরী হয়, অদক্ষ কর্মী দ্বারা অপরিছন্ন, কুৎসিত, বাজে প্রডাকশনই তৈরী হয়। যার ফলে সমাজে ঘটে নুংরা কাজ গুলী, এদের দ্বারা কুলসিত হয় ঘর, জাতি, দেশ, সমাজ

কোমল স্নেহের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয় স্থল নারীর আচল, সেটা মা, বোন আর যে কোন নারীর আচল হতে পারে। একটা সংসার স্বর্গে পরিণত করতে পারে নারী আবার নরকে পতিত করতে পারে নারী। কেহ পুরুষকে গোলাম বানিয়ে সে হয় গোলামের বউ, বোন, মা, আবার অনেকে পুরুষকে রাজা বানিয়ে সে হয় রানী, শাহজাদী, সম্রজ্ঞী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতায় ধরাধামে স্বর্গ নির্মানে নারীর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকেই নারীকে পন্য হিসেবে ব্যবহার করতে করতে নারীরা এখন নিজেরাই পন্য হিসেবে সেজে যায়। আদিমকাল থেকেই পুরুষ তার নিজেদের প্রয়োজনে নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। এখন সময় নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার এবং আধিপত্য বিস্তারের সময়। কাল পরম্পরায় কিছু নারী তাদের অধিকারের নামে নিজেদেরকে পন্য হিসেবে হাজির করছে সমাজের স্তরে স্তরে। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সারা বিশ্বে একটা প্রভাব বিরাজমান, নারীর অধিকারকে সফল করার লক্ষ্যে সারা বিশ্ব কাজ করে চলেছে, নারীর দাবি ও ন্যায্যতা আদায়ে তৎপর আইনি ব্যবস্থা।
/span>
মানব সভ্যতায় নারীকে কেন্দ্র করে অনেক বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, অনেক নগরী ধ্বংস হয়ে গেছে, অনেক রাজ্য বিলীন হয়ে গেছে, অনেক বাদশাকে নামিয়েছে পথের ভিখেরিতে। আবার অনেক পুরুষ নারীর কারনে ফিরে পেয়েছে তার আধিপত্য, ঐতিহ্য, সম্মান। কালান্তরে সমাজ বাস্তবতায় নারী এসে দাড়িয়েছে একবিংশ শতাব্দীর স্যাটেলাইটের বিচিত্র স্তম্ভে। রঙ, রূপ, রসের রকমারী বিস্তারে ব্যাকুল কিছু রহস্যময়ী নারী। তারা নিজেদেরকে পন্য বানিয়ে সুন্দরকে ব্যাহত করছে। 

চারদিকে যখন নারীর জয় জয় কার, কিছু নারী ক্ষমতাকে পুজি করে ধরা কে সরা জ্ঞান মনে করে নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরছেন সমাজের কাছে। সমাজের প্রত্যেকটা স্তরে নারী খেকো শেয়ালেরা উৎপেতে থাকে, নারীরাও সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়। উন্নতদেশের সংক্রামনের প্রভাবগুলো নারীরা গ্রহন করে বহু পুরুষের সঙ্গে মেতে উঠেন, ফলে আমাদের দেশে দেখা যায় পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, সাংসারিক বিচ্ছেদ, অশান্তি ইত্যাদি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অধিকার আদায়ের তাগিদে কেউ কেউ নিজেদের পন্য বানিয়ে ভিন্ন স্বাদ গ্রহন করছে।

একবিংশ শতাব্দিতে ছেলে মেয়ের রিলেশন খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়, এটা পরিবারগুলোও সবাই মানতে শুরু করে দিয়েছে। যত প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে তার ব্যবহারে মেয়েরা যেন তত বেশি নিজেদের পন্যে রূপান্তরিত করছেন। সম্পর্ক শুরু হয় ভার্চ্যুয়াল জগৎ থেকে, আর এ জগতে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে জামা খোলাটা যেন অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। যে যত বেশি শো আপ করতে পারবে তার পিছে তত বেশি পুরুষের লাইন থাকবে। এ জগতে চলে সম্পর্কের প্রতিযোগিতা, যার যত বেশি সম্পর্ক তার মাসিক আয় টাও যেন বেশি। এখন সম্পর্কগুলো যেন টাকার আর শারীরিক চাহিদার উপর নির্ভর করেই চলে যাচ্ছে। কিছু কিছু নারী শরীলটাকে বিনিয়োগ হিসেবেই শপে দিয়েছেন। যত নতুন সম্পর্ক তার আয় ক্রমান্নয়ে বৃদ্ধিই পেতে থাকে, আর কিছু মালদার পার্টি পেলে তো কথাই নাই, সারা জীবন নাকে খর দিয়ে ঘুড়াবে। তাদের কাছে আত্নিক সম্পর্কের চেয়ে আর্থিক সম্পর্কের গুরুত্বটা বেশি

ভার্চ্যুয়াল প্রেম গুলো বেশির ভাগ যৌন চাহিদার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে। প্রথম দিন কথা হয়, দ্বিতীয় দিন গভীর প্রেম, কয়েকদিন পর সব কিছু খুলে দেয়া হয়, খোলাখুলি না হলে সম্পর্ক ওই জায়গাতেই স্টপ। ছেলেরা আরেক প্রজেক্টে দৌড়ায় মেয়েরাও আরেক স্টপেজে থামেন। সম্পর্কগুলোর স্থায়িত্বকাল যেন বীর্যপাত হওয়া পর্যন্তই। কিছু কিছু মেয়েরাও অবিরাম সম্পর্ক করেই যাচ্ছে, নিজেদের পন্য হিসেবে ছেলেদের বিছানায় হাজির করছে, নিজেদের অস্তিত্বকে হালকা ও মূল্যহীন করে দিচ্ছে। নিজেদেরকে যৌন পুতুলে পরিণত করছে, ছেলেরা যেভাবে চায় সেভাবেই ব্যবহার করছে। প্রতিদিনকার আবদারে চলে ভিডিও কলে য়ৌন লীলা, মেয়েদেরকে বলার সাথে সাথে কিছু মেয়ে স্তনের বস্ত্র খুলে ফেলে, যৌনাঙ্গের কাপড় খুলে খিস্তি করা শুরু করে দেয়, বেশিরভাগ পরিনতি ঘটে ভার্চ্যুয়াল জগতে যৌন বিনোদন হিসেবে। এখন গুটি কয়েক নারী সম্পর্ককে এমন পর্যায় নিয়ে গেছে যে প্রিয়জনকে খুশি করতে, প্রিয়জনের কাছ থেকে সার্থ হাসিল করতে বাথরুমে ঢুকে নিজেদের যৌন ভিডিও করে পাঠানো হয়। আর সেই ভিডিও কতদুর পর্যন্ত গড়ায় তা সে নারী চিন্তাই করে না। বিশ্বাসের সম্পর্ক গুলো তো জন্ম জন্মান্তর টিকে থাকে, আর সার্থের সম্পর্কগুলো পন্যে যেয়ে রূপান্তরিত হয়।

গুগল পাড়ায় মেয়েদের ভাইরাল ছবি, ভিডিও, রেকর্ডিংয়ের ছড়াছড়ি। তারা নিজেদেরকে পন্য হিসেবে মেনে নিয়েছেন বলেই ওপর পক্ষ হয়তো সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছে। এখন হরহামেশাই দেখা যায় রিক্সা, বাস, ট্রেন, পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে মানুষের সামনেই স্তন মর্দনের বেলাল্লাপনা, দেখে মনে হয় মেয়েটার যেন বুকে ব্যথা ছেলেটাকে বলেছে বুকে হাত দিয়ে থাকার জন্য, তাই ছেলেটাও সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যৌন চাহিদা যেন এখন প্রেমের মূল উপাদানে দাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে মেয়েরা নিজেদের পন্য হিসেবে তুলে ধরছেন বলেই কিন্তু ছেলেরাও সে সুযোগটা নিচ্ছে। আর যদি কোন মেয়ে বাধা দিত যে, আমরা বাইরে নিজেদের যৌন চাহিদা গুলো প্রকাশ করবো না, কোন সময় সুযোগ হলে ঘরের ভিতরেই নিজেদের মধ্যেই তা আবদ্ধ রাখবো! তাহলে হয়তো রাস্তাঘাটে বুক মালিশের দৃশ্যগুলি দেখতে হয়না। সম্পর্কের মাঝে এক পর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কের দিকে গড়ায়, এখন তা যদি মানুষের বিনোদনের ঘোরাক হয়ে যায়, তবে সে সম্পর্কের মাহাত্য কতদুর পর্যন্ত গড়াবে? সম্পর্কের এমন পর্যায়ে নিজেদের নিয়ে যায় যে ঝোপ, ঝাড়, জঙ্গল, খোলা মাঠ যে কোন জায়গায় যৌন লীলার কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেন। সেক্ষেত্রে মেয়েরা যদি নিজেদের আত্নমর্যাদার দিকে তাকাতো তবে হয়তো হাটে-ঘাটে যৌন লীলার দৃশ্যগুলো দেখতে হতো না।

আধুনিকায়নের নামে এখন পরকীয়ার যে লম্বা কাহিনী পরিলক্ষিত হয়, বহু বিবাহের যে উৎসব হয়, যৌন লীলার যে রঙ্গমঞ্চ গড়ে উঠে, মেয়েরা যদি নিজেদের আত্নমর্যাদা ধরে রেখে সম্পর্ক গুলোতে পদার্পন করে তবে হয়তো উন্মোক্ত যৌনচিন্তা কিছুটা হলেও লোপ পেত, নিজেদের কে পন্য হিসেবে কেউ ব্যবহার করতে পারতো না। উপরোক্ত বিষয়গুলোতে যে মেয়েদের শতভাগ দোষারোপ করা হবে তা নয়, ছেলেরাও এই নিন্দুকের বাহিরে নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতায় অনেক অসঙ্গতি হয়তো পুরুষের দ্বারা হয়, তাই বলে আধুনিকায়নের এই যুগে নিজেদের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়ে নিজেরাই পন্যে রূপান্তরিত হবে তা নারীর মর্যাদায় বড় ধরনের আঘাত হানে। নিজেদের মর্যাদার দিকে যদি নারীরা সচেতন হয় তবে অন্তত নিজেদের পন্য হিসেবে কেউ ব্যবহার করতে পারে না, যৌন চাহিদা দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয় না, বসের বিছানায় শুয়ে চাকরিটা টিকিয়ে রাখতে হয় না, ভিডিও কলে জামা-কাপড় খুলে দেখাতে হয় না, রাস্তাঘাটে অসম্মানী হতে হয় না, নিজের সম্ভ্রম দিয়ে অন্য পুরুষকে খুশি করতে হয় না, নিজেকে বিক্রি করে দিতে হয় না।

Sunday, May 31, 2020

May 31, 2020

সেচ্ছায় মৃত্যু যাপনের দিকে বাংলাদেশ এবং ভবিষ্যৎ

সেচ্ছায় মৃত্যৃ যাপনের দিকে বাংলাদেশ এবং ভবিষ্যৎ


লকডাউনের প্রায় ৭০ তম দিন থেকে সব কিছু মোটামুটি খুলে দেয়া হচ্ছে। স্কুল, কলেজ আপাতত কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে না। অর্থনীতির বেহাল দশা ঠেকাতে, মানুষকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার তাগিদে, সামাজিক নিয়ম মেনে চলার নীতিতে শিথিল করা হচ্ছে লকডাউন। ঈদ পরবর্তী সময়ে করোনা সনাক্তের সংখ্যা দাড়ায় প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি। মৃতের সংখ্যা প্রায় ছয়শ এর বেশি। মানুষ ভয়কে জয় করার প্রত্যয়ে নিজেদের কর্মস্থলে ফেরত আসতে চায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষ জানে করোনা রোগীর পরিণতি কি হয়, কত কষ্ট হয়, কত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। যারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে না, তারা মৃত্যু বরন করে। করোনা পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের গলায় টান পড়েছে, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অন্তকালের সম্মুখিন। এক খবরে শোনা যায়, চিনে নাকি এখনও এ রোগ পুরোপুরি সেরে উঠেনি, এর প্রতিষেধকও তেমন ভাবে বের হয়নি, তারা নাকি গরমপানির উপর দিয়ে করোনাকে জয় করে নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশ তাদের মত করে এর প্রতিষেধক বের করছে এবং এর ব্যবহার করছে। শতভাগ কার্যকর না হলেও সিংহভাগ সফলতার মুখ দেখছে সকল দেশ। মৃত্যু হার তুলনামুলক অনেক কমেছে। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু মানুষের মৃত্যু ভয় দিন দিন কমছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে এখন মৃত্যুকে পুজি করেই পথ চলতে হবে। মানুষ নিয়তিকে মেনে নিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছে। মরন ঘন্টা সবারই একসময় বাজবে, মরার আগেই যদি মরে যাই তবে দ্বায় বদ্ধতা পিছন ছাড়বে না।

এখনও আপাতত গ্রামে করোনা ভাইরাস তেমন বিস্তার লাভ করতে পারে নি। এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট আক্রান্ত ৪৫ হাজারের মত, বেশির ভাগই বড় বড় শহর অঞ্চল গুলোতে। ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চট্রগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, জামালপুর সহ শহর অঞ্চল গুলোতে করোনা রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে। গ্রাম গুলোতে গেলে লগডাউনের মধ্যে দেখা গেছে বাজার গুলো আগের মত সব কিছুই খোলা, মানুষের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করে না। তাদের মধ্যে একধরনের ধারনা, করোনা রোগ নিয়ে কেউ মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছে, আসলে করোনা বলে কিছু নেই। কত রোগ হইলো কিছু হইলো না, আর করোনা আর কি করবো। তাদের ধারনা আল্লাহ বড়লোক দেশগুলারে গজব দিসে, আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু আমাদের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কে জানে আমেরিকার বিষেশজ্ঞদের ধারনা কি সত্যি হয়ে যায় কি'না। তাদের ধারনা আমাদের দেশে এক-তৃতীয়াংশ লোক করোনায় আক্রান্ত হবে। যদি এটাই সতি্য হয় তবে বাংলাদেশ নামের এক ভুখন্ড পৃথিবীর মানচিত্রে ঝুলে থাকবে। আঠারো কোটির বাংলাদেশে সত্তর দিন লকডাউনের ফলে অর্থনীতির যে বেহাল দশা হয়েছে, আরো কিছুদিন থাকলে মানুষ খুদার জ্বালায় রাস্তায় নেমে আসতো। সরকারী ভাবেও বেশ সহযোগীতা চালিয়েছে সারাদেশে, কিন্তু সরকারেরও তো একটা লিমিটেশন আছে! আমাদের দেশ তো আর কানাডার মত উন্নত দেশ নয় যে মাসের পর মাস আমাদের ঘরে বসিয়ে মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করবে।

জুন মাস পরে গেল, লকডাউন পনের দিনের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সব কিছু করতে বলা হয়েছে, নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জুনের পনের তারিখ পর্যন্ত। পনের দিনের ফলাফল দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মানুষ তাদের কর্মে ফেরার জন্য এতটাই মুখিয়ে আছে যে, ঘোষনা শুনতে দেরি হয়েছে কিন্তু সবকিছু খোলার প্রস্তুতি নিতে দেরি হয় নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো সল্প পরিসরে খোলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, হাট বাজার বিকাল চারটা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা বলেছেন। বগুড়ায় ঈদের আগে ১/২ দিন শপিং করার জন্য মার্কেট সল্প পরিসরে খোলা ছিল, ফলশ্রুতিতে একসাথে পঞ্চাশ জনের করোনা পজেটিভ আসে দুদিন পরেই। রোজার মধ্যে গিয়েছিলাম জরুরি কাজে ঈশ্বরগঞ্জ, সেখানের বাস্তব চিত্র দেখে আমার মনে হয়েছে এদেশ থেকে লজ্জায় করোনা পালিয়ে যাবে, যে দেশে মানুষ এ রোগটিকে দামই দিচ্ছে না, অথচ এ রোগ পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে কাদিয়ে ছেড়েছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নাকানি-চুবানি দিয়ে ছেড়েছে। আর আমাদের দেশে লবন পান্তার মত ব্যাপার হয়ে দারিয়েছে। যেটা চোখে পরার মত ছিল, হাট-বাজারের সকল দোকান পাঠ খোলা, কারো মুখে মাস্কের বালাই নে, সামাজিক দুরত্ব তো চিন্তাই করা যায়, আর চায়ের দোকানের আড্ডা যেন আগের চেয়ে আরো বেশি প্রাণ পেয়েছে। বড় কথা হচ্ছে সারা দেশে যেখানে সভা সমাবেশ এবং লোকসমাগম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেখানে ঘটা করে ইফতার পার্টি করা হয়। এটা হচ্ছে শহরতলী থেকে খুব কাছে একটি গ্রামের ঘটনা, আর সারা দেশে ৬৮ হাজার গ্রামে নিশ্চই এই অবস্থার ব্যতিক্রম হবে না। 

যেভাবেই হোক কিছু মানুষ তাদের জেলায়, থানায়, ইউনিয়নে কিছু মানুষ আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে যানবাহনগুলো বন্ধ থাকার ফলে, তা না হলে দেশে জগাখিচুরি কান্ড বেধে যেত। বগুড়ায় এক ঘটনা শুনে না হেসে পারা যায় না, এক মেয়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তে তার টেষ্ট করাতে দিয়েছে, তার পজেটিভ ধরা পরেছে, এখন পুলিশ গেল তার বাড়ীতে তাকে হসপিটাল নিয়ে যাবার জন্য, পুলিশ বাড়ীতে যেয়ে দেখে সে মেয়ে মার্কেটে গেছে ঈদের শপিং করার জন্য। পুলিশ তার মা কে বললো আপনার মেয়েকে তো নিয়ে যেতে হবে! তার মা উত্তর দিল, মেয়েটা মার্কেট থেকে ফিরে এলেই কাপড়-চোপড় দিয়ে আপনাদের সাথে পাঠিয়ে দিব। তার পরিবারের অবস্থা দেখে পুলিশদের কাপড় নষ্ট করে দেবার অবস্থা। এমতাবস্থায় সব কিছু খুলে দেয়া হলে ভাবা যায় আমাদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াবে! আমাদের মত দেশের সচেতনতার চেয়ে বেচে থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে। আটকে পরা শহরের মানুষগুলো গ্রামের দিকে দৌড়াবে, গ্রামের লোকদের বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরে পাড়ি জমাবে, এভাবে মায়ার বন্ধনে লেপ্টালেপ্টি হয়ে যাবে পুরো দেশে করোনা ভাইরাস। ছয়শো মৃত্যু হয়তো দেশের জন্য বড় ক্ষতি নয়, কিন্তু ছয়শো পরিবারের খুব বড় ধরনের ক্ষতির কারন হয়ে দারাবে। এভাবে ব্যক্তি থেকে পুরো দেশের করোনা পজেটিভ এলে সামাল দেবার উপায় খুঁজে পাবে তো? হয়তো প্রয়োজনেই সবাই বের হয়, কিন্তু করোনার ভাইরাস নিয়ে ঘরে ঢুকবে এটা কেউ চিন্তা করতে পারে না। আগামী অবস্থার প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ভাসমান, আমরা চিন্তা করছি সেদিকেই কি চলছে দেশ! যদি সেদিকেই ধাবিত হয় কি হবে আমাদের ভবিষ্যৎ, কিভাবে রুখবো করোনা নামক মহা দানবের আগ্রাসন। সেই প্রার্থনা দিয়ে আকাশের মালিকের দিকে চেয়ে থাকা, কি হবে আমাদের পরিণতি!

Monday, May 25, 2020

May 25, 2020

যানবাহনের চাকার সাথে শ্রমিকের জীবন চাকাও আটকে গেল

যানবাহনের চাকার সাথে শ্রমিকের জীবন চাকাও আটকে গেল


ঘুরছে চাকা চলছে দেশ, উন্নয়নের বাংলাদেশ। চাকা ঘুরলে দেশ চলবে, চাকা আটকে গেলে মানুষের জীবন চাকার গতিও আটকে যায়। থমকে যায় প্রকৃতি, স্থবির হয়ে যায় মানুষ, অচল হয়ে যায় শিল্প কারখানা। দ্বিপ্রহরের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে অন্ধকারে পৃথিবী আচ্ছন্ন হবার পর পর্যন্ত অবিরাম চলে মানুষের গন্তব্যে পৌছে দেয়ার কাজ। সূর্যের আলোর সাথে আর দেখা মেলে না সন্তান পরিজনদের সাথে। সূর্যের আলোয় জনসাধারনের তিক্ত, মিষ্ট উচ্চারনের সাথেই অতিবাহিত করতে হয় যানবাহনের শ্রমিকদের। জীবন পাখি নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে ছুটে বেড়ায় অলি গলি হাইওয়ের বাইপাস, ছুটে চলে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। যানবাহনের চাকার সাথে তাদের সংসারের চাকাও বাধা। চাকা ঘুরলে সংসার চলবে, চাকা না ঘুরলে সংসারও থেমে যায়। মহামারী করোনায় লকডাউনে আটকে পড়া গাড়িগুলোর মাঝে জং ধরতে শুরু করেছে, আর কয়েকদিন পর হয়তো অচল হয়ে যাবে। একই ভাবে জং ধরেছে সেই যানবাহনের সাধারন শ্রমিকদের সংসারেও। মরিচা পরে অচল প্রায় সংসার, কোন মত ধাক্কা দিয়ে চালাচ্ছে সংসার। মৌলিক চাহিদাগুলো পূরন হচ্ছে না, বউ বাচ্চাসহ তাকিয়ে আছে অন্যের হাতের দিকে, কেউ যদি কিছু দেয়, তাহলে বউ বাচ্চা নিয়ে বেচে থাকতে পারবে।

যানবাহন বা পরিবহনের শ্রমিকরা প্রায় আড়াই মাস পাড় হয়ে গেল করোনা পরিস্থিতির কারনে তাদের কাজে যোগ দিতে পারছেন না। তাদের বেশির ভাগ শ্রমিক দৈনিক চুক্তিতে বেতন ভুক্ত। আমাদের দেশে প্রায় সত্তর লক্ষ যানবাহনের শ্রমিক আছে। এর মধ্যে ছোট, বড়, মাঝারি কিছু ট্রাক পণ্য আনা নেয়া করার জন্য চালু আছে, আর সকল প্রকার বাস চলাচল বন্ধ আছে। আমাদের দেশে গ্রাম শহর মিলিয়ে প্রচুর বাস রাস্তায় চলাচল করে। একটি বাসের সাথে চার-পাঁচজন শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত। আরো তো রোডে অনেক শ্রমিক রয়েছেই। শুধু আমাদের দেশ নয়, পৃথিবীর সকল দেশেই যান চলাচল বন্ধ আছে (শুধু জরুরী প্রয়োজনীয় যান ছাড়া)। আমাদের দেশেও প্রয়োজনীয় যানবাহন ছাড়া সবই বন্ধ আছে। সামাজিক ভাবে যানবাহনের শ্রমিকরা এক বিশাল অংশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাদের অবস্থান ধর্মঘটে সারাদেশ অচল হয়ে যায়। বর্তমানে মহামারীর প্রভাবে যানবাহন বন্ধ থাকায় একটি বৃহৎ শ্রমিক সমাজ ঘরবন্ধি হয়ে যায়। তাদের সকল আয়ের পথ এখন প্রায় বন্ধ, অনেকে সংসার নিয়ে আছে বিপাকে, কিভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেদেরকে বাচিয়ে রাখবে, তার হিসাব মিলছে না কোন মতে।

যানবাহনের শ্রমিকদের বেশিরভাগ শ্রমিক অস্থায়ী দিনচুক্তিতে আবদ্ধ বলে গাড়ি না চললে মায়নে দেয়ার প্রশ্নটাও আসে না। শ্রমিকদের মুখে হতাশার উচ্চারন শোনা যায় যে, তাদের মালিক, কোম্পানী বা সরকার কোন রকম সাহায্য তাদের করছে না, এখন তারা প্রায় নিরূপায়। কেউ কেউ রাস্তায় নেমে তাদের দাবিও জানিয়েছেন। দেশ স্বাভাবিক থাকতে দেখা যেত এক মোড় থেকে আরেক মোড় পাড় হতে গেলেই হাজার হাজার নেতার নামে চাঁদা তোলা হতো। এখন চাঁদা ভোগকারী নেতারা কোথায়? যারা শ্রমিকের ঘাম ঝড়ানো টাকা দিয়ে এসি রুমে বিলাসবহুল দিনযাপন করেন, এগিয়ে আসুন সেই সকল যানবাহন শ্রমিকের পাশে,  যারা সারাদিন মানুষকে গন্তব্যে পৌছে দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকে। মহামারীর দিনগুনা যে কবে শেষ হবে তার কোন সঠিক তথ্য কেউ জানেনা, কবে থেকে রাস্তায় চাকা ঘুরবে তা'ও কেউ বলতে পারে না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সাধারন শ্রমিকরা পতিত হয়েছে হতাশার অথই সাগরে। আবার করোনার পরবর্তী সময়ে চাকা ঘুরলে হাজার হাজার শ্রমিকের সংসারের চাকা আবার ঘুরবে, ঈদ নয়, বেচে থাকাটাই যখন দুঃসহ, সেখানে ঈদ তো বিলাসিতা। ওই নীল সমুদ্রের মালিকের কাছে আকাঙ্খা গুলো জমা রইলো, তার যদি কৃপা হয়, তবে সবাই একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, গন্তব্য থেকে গন্তব্য ছুটে বেড়াবে, পরিবারের মুখে ফুটে ওঠবে এক মিষ্টি হাসির ঝলক, সেই সুদিনের পথে চেয়ে থাকা তীর্থের কাকের মত।

Tuesday, May 19, 2020

May 19, 2020

যাকাত হতে পারে করোনায় অসহায়দের সহায়

যাকাত হতে পারে করোনায় অসহায়দের সহায়



চলছে রমজান মাস, মুসলমানদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে সর্বশ্রেষ্ট মাস। এ মাসেই নাযিল হয়েছিল পবিত্র কোনআন মাজিদ, এ মাসেই সুযোগ হয় সকল গুনাহ থেকে মুক্তি পেয়ে পবিত্রতায় শানিত হবার।  এ মাসের ফজিলত বর্ননা করে শেষ করা যাবে না। এ মাসেই ধনী-গরীব এক কাতারে এসে নামাজ আদায় করে এবং একাত্ব মতে পৌছানোর সুযোগ হয়। ধর্ম মানে শান্তি, শান্তির বার্তা প্রত্যেকের ঘরে পৌছে দেওয়ার জন্য যাকাতের বিধান রয়েছে। যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ। বলা হয়ে থাকে ইসলাম যদি একটি তাবু হয়, যাকাত হচ্ছে সেই তাবুর মধ্যম খুটি। তাবুর জন্য মধ্যম খুটি কি যে জরুরী তা সকলের বোধগম্য আছে। একটা তাবুর মাঝখানের খুটি একটু বড় হয়, যেটার উপর ভর করে তাবুটি দাড়িয়ে থাকে। একটা তাবুর চারপাশের খুটি যেমন খুব দরকারী, মাঝখানেরটা ঠিক তেমনই গুরুত্ব বহন করে। যাকাতের মাধ্যমে ধনী গরিবের সমতা ফিরিয়ে আনা হয়। আল্লাহ তায়ালা সম্পদের উপর গরীবের হক পালন করে দারিদ্রতা দুর করার জন্য যাকাত বেশ গুরুত্ব বহন করে।


হাদিসে আছে, বান্দার সম্পদের উপর দরিদ্রের হক রয়েছে, তা যথাযথ ভাবে না পূরন করলে এর শাস্তি জীবিত অবস্থায় ভোগ করতে হবে। মানুষ তার টাকাকে বাড়ানোর জন্য তার গচ্ছিত টাকা ব্যাংকে রাখে, যা থেকে প্রতি মাসে লাখে একহাজার করে টাকা আসে, যার পরিমান দাড়ায় ৭-৮ বা ১০%। আর ইসলামে বলা আছে যারা তার সম্পত্তির আড়াই পার্সেন্ট যাকাত হিসেবে দিবেন আল্লাহ তাদেরকে ৭০হাজার % লাভ দিবেন। বিশ্বাসের ধর্ম ইসলামে আল্লাহ তার বান্দাদের সম্পদের সুষম বন্টনের জন্য যাকাদের ব্যবস্থা করেছেন। কোরআন মাজিদে যেখানে সালাতের কথা আছে তার পাশে যাকাতের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে ৮৬ বার যাকাতের কথা উল্লেখ আছে। যাকাত ইসলাম ধর্মে যাদের সামর্থ আছে তাদের জন্য ফরজ। যারা এই ফরজ কায়েম করবে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে এর সুফল ভোগ করবে, আর যাদের উপর ফরজ কিন্তু কায়েম করবে না, তারা এর শাস্তি দুনিয়াতেই ভোগ করবে, আর আখিরাতের হিসাব তো বাকিই আছে।

অন্যান্য ধর্মেও এরকম ব্যবস্থা দেখা যায়, যেমন, হিন্দু ধর্মে ডোনেশন, খ্রিষ্টান ধর্মে চেরিটি, কিন্তু ইসলামে যেভাবে এর বন্টনের কথা বলা আছে অন্য ধর্মে উল্লেখযোগ্য কম। ইসলাম ধর্মে যাকাতের মাধ্যমে কোন দরিদ্র, বিপদগ্রস্ত এবং অভাবী মানুয়ের কল্যানের জন্য এর ব্যবস্থা করা আছে। যার দারা সকলেই যেন সচ্ছ সফল হয়ে বেচে থাকতে পারে এবং আল্লার ইবাদত করতে পারে। এক বান্দার পেটে যদি খোদা নিবারনের চিন্তা থাকে, সে খুদা নিবারন করার জন্য ইবাদতের কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা যাবে।


ইসলাম ধর্মে য়াকাত ফরজ করেছে সেই সকল বান্দার উপর, যাদের সামর্থ আছে, যারা নিজেদের প্রয়োজন ব্যতিত গচ্ছিত সম্পদের উপর, মানে নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর যা গচ্ছিত থাকে তা উপর। যাদের ঘরে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ পরিমান বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা পরিমান সম্পদ আছে তাদের উপর যাকাত ফরজ। এখন রূপার হিসাব করতে গেলে যে নর-নারীর কাছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা আছে তার উপরই যাকাত ফরজ। তা সে ছাত্র, নারী যেকোন নর নারীর হোক না কেন। অবশ্য মানসিক শারীরিক বিকারগ্রস্থদের হিসাব টা ভিন্ন।


যাকাতের মাধ্যমে একটা জাতিকে কিভাবে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তা জলন্ত উদাহরণ প্রাচ্চ্যের ইসলামী রাষ্ট্র গুলো। সৌদি আরবের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, সেখানে যাকাত নেওয়ার চেয়ে, যাকাত দেয়ার লোক বেশি। সেখানে সরকারীভাবে যাকাত উত্তোলন করে তা দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা হয়। এখন তারা এমন একটা পর্যায় পৌছেছে যে, তাদের দেশে যাকাত নেয়ার লোক খুজে পাওয়া যায় না, যার জন্য তারা যাকাতের টাকা অন্য দেশের কল্যানের জন্য পাঠিয়ে দেয়। আমাদের দেশেও যদি যাকাতের সুষ্ঠ বন্টন করা যায়, যাদের উপর ফরজ আছে তাদের গচ্ছিত সম্পত্তির আড়াই % দেয়, তাহলে মহামারী করোনায় কিছুটা হলেও বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবে। আমাদের দেশে করোনার জন্য অনেক পরিবার পথে বসে গেছে, অনেক পরিবার ব্যবসা বানিজ্য গুটিয়ে বাসায় বসে আছে, ঘরের প্রয়োজনীয় খাবার বলতে নেই। আমাদের দেশে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বাড়ির গেরস্থ থেকে শুরু করে যে কোন পেশার লোক প্রচুর পরিমানে আছে যারা লাখপতি মানে লাখ টাকার মালিক। আর যাদের লাখ টাকা গচ্ছিত থাকে তাদের উপরই আড়াই হাজার করে ফরজ হয়ে যায়। আর যাদের আরো বেশি আছে তাদের যাকাতের পরিমানটা আরো বাড়বে। যদি আমাদের দেশে আঠারকোটি মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি মানুষ লাখপতি হয়ে থাকে, তারা যদি আড়াই হাজার টাকা করে যাকাত দেয় তাহলে প্রায় ১২৫০ কোটি টাকা উঠে। যা কি'না আমাদের দেশের দরিদ্রতা দুর করায় বিরাট ভুমিকা রাখবে। আরো তো হাজার হাজার কোটি পতি আছেই। একজন যদি এককোটি টাকার মালিক হন, তাহলে তার উপর আড়াই লাখ টাকা ফরজ। আড়াই লাখ টাকা যদি দশটা দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়, তবে পচিঁশ হাজার করে প্রতি পরিবারে পরবে। পচিঁশ হাজার টাকা দিয়ে কেউ যদি চায় ছোট খাটো অনেক ব্যবসা করতে পারবে, যা কি একটা পরিবারের সচ্ছলাতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশে যদি পঞ্চাশ লাখ টাকার মালিক পঞ্চাশ হাজার জন হয়, তাদের টাকার উপর যাকাত ফরজ হয় এক লাখ পচিঁশ হাজার টাকা করে। যদি পঞ্চাশ হাজার লোক এক লাখ পচিঁশ হাজার টাকা করে যাকাত দেয়, তবে, মোট টাকা দাড়ায় ৬২৫০ কোটির উপরে। যদি এই মহামারী করোনার সময় ৬২৫০ কোটি টাকা যদি দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা যায়, তাহলে, হাজার হাজার দরিদ্র লোক সচ্ছলতার মুখ দেখতে পারবে।


যাকাত গ্রহন করবে কারা? যারা দিন আনে দিন খায়, যাদের কোন গচ্ছিত সম্পদ নেই, যারা নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না, যাদের শারীরিক মানসিক সমস্যায় আছে, যারা অচল, কাজ কর্ম করতে পারে না, যারা অভাবী এবং বিপদগ্রস্থ প্রত্যেক নর নারী যাকাত নিতে পারবে। যাকার দরিদ্রদের হক এবং অধিকার। যাকাত নিয়ে বলা হয, যারা যাকাত নিচ্ছে তাদের চেয়ে যারা যাকাত দিচ্ছে তারা বেশি উপকৃত হচ্ছে। কেননা আল্লাহ যাদেরকে সম্পদ দিচ্ছেন তাদেরকে সেই সম্পদ গচ্ছিত রাখতে আটকে রাখতে নিষেধ করেছেন। গচ্ছিত সম্পদ যত ব্যবহার হবে তা বেড়েই যাবে। তাই গচ্ছিত সম্পদের উপর নির্ধারিত যাকাত নিয়ে যাকাত দেনেওয়ালাদের যাচিয়ে দেন। এক্ষেত্রে গরীবরা ধনীদেরকে বাচিয়ে দেয় যাকাত নিয়ে। যাকাত যার উপর ফরজ আছে তারা যদি দরিদ্রদের সেই হক পুড়া না করেন তাকে এই দুনিয়াতেই তার শাস্তি ভোগ করতে হবে। আমাদের দেশে দেখা যায় হসপিটাল গুলোতে কেমন ভিড় লেগেই আছে, মানুষকে অসুখ যেন ছাড়তেই চায় না, দেখা যায় একটা ছোট অপারেশন করাতে এক দেড় লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এমনও তো হতে পারে যে, তার উপর যাকাত ফরজ হলেও সে তা পূরন করে নি। এটাও তার উপর শাস্তি হতে পারে। বলা হয় যার উপর যাকাত ফরজ সে যদি যাকাত না দেয় তার নামাজ কবুল হবে না, আর যদি নামাজ কবুল না হয় তালে বেচেশত পাওয়াও একটু দুর্গম হয়ে যাবে। 


আমাদের দেশ যেহেতু ইসলাম ধর্ম প্রধান, সেহেতু যাদের উপর যাকাত ফরজ আছে, তারা যদি গরীব দুঃখিদের মাঝে সেই যাকাতের টাকা বন্টন করে দেয়, তাহলে এই দুর্ভিক্ষ, মহামারী করোনা থেকে হাজার হাজার পরিবার বেচে যেতে পারে, ফিরে পেতে পারে নতুন জীবন, দেখতে পারে সচ্ছলতার মুখ, সেও পরবর্তীতে যাকাত দেনেওয়ালা হতে পারে, হাজার হাজার মুখে হাসি ফুটে উঠতে পারে, সেই হাসি যদি আল্লাহ কে খুশি করতে পারে তাহলে ইসলাম ধর্ম মতে সেই যাকাত দেনেওয়ালারা আল্লাহর বেহেশত পেয়ে যেতে পারে।

Friday, May 15, 2020

May 15, 2020

চারদিকে মহামারী; অনিশ্চিত সঙ্কটের দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন

চারদিকে মহমারী; অনিশ্চিত সঙ্কটের দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন



বেলা বয় অরিন্দম জীবনের অগনিত সময়ের প্রতিকুল মুহূর্তের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে। দিগন্তে রবি উঠে দিগন্তে হারায়, এরই মাঝে ভেসে আসে আহাজারী আর মানুষের কান্না। বাড়ছে লাশের মিছিল, থামছেনা আক্রান্তের সংখ্যা, পলকে বেড়েই চলেছে রোগী। অস্পষ্ট ভবিষ্যতের আগাম বার্তা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, থমকে দিচ্ছে জনমানুষের জীবনের গতি, আটকে আছে শিল্প নগরীর চাকা, নির্বাক কোটি কোটি মানুষের চোখ। এর মাঝেও কিছু মানুষের আনন্দের স্ফুলিঙ্ক বেয়ে চলেছে, আগাম উৎসবের আনন্দকে কিছুতেই হারাবে না। অন্যদিকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন চলছে আতঙ্কে, সঙ্কায়, অনিশ্চয়তায়। অবারিত কান্নার সুর মোহময় হয় মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের গোড়দোড়ায়। উচ্চবিত্ত গুনছে হিসেবের খতিয়ান, কোন দিকে পুষিয়ে তুলতে পাড়ছে না সময়ের শূন্যতায়। নিবীড় পর্যবেক্ষনের আশায় পিদিম জলছে না চিন্তশীল মানুষের। হিসেব কষে মাথায় বাজ পড়ছে ব্যবসায়িদের, কি চলছে এসব! টিকে থাকবো তো! আবার কি মা'কে খুশি করার জন্য একখানা শাড়ী আর বউকে খুশি করার জন্য হাউসের গয়না কিনে দিতে পারবে! শেষ পরিণতি কি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে কি'না সে নিয়ে সন্ধিহান। শিক্ষার আলো থেকে আড়াল পড়েছে ছাত্রজীবন, অনিশ্চতায় বাস্তব পরিস্থিতি। আবার কি একই ক্লাসে সবাই কি ফিরতে পারবে, না'কি কেউ ছিটকে পড়বে! সব শিক্ষক কি হাজিরা দিবেন ক্লাসে না'কি কেউ কেউ মহামারী করোনায় হারিয়ে যাবেন, তা অনিশ্চয়তায় পর্যবেশিত হয়েছে।


করোনা মহামারীর বিস্তার রোধের জন্য মার্চ মাসের প্রথম দিক থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছিল। এর আগ মুহূর্তে চলছিল এসএসসি পরীক্ষা, স্কুল গুলো পরীক্ষার জন্যও বন্ধ ছিল। এইচএসসি পরীক্ষাটা অনিশ্চিত গন্তব্যে পৌছেছে। সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হলে ছাত্ররাও ঘরমুখো হয়, আটকে পরে চারদেয়ালের মাঝে। প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখলে ছাত্র ছাত্রীরা পড়াশোনার স্পর্শে থাকে, আর প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাইরে চলে যায়। একটা অংশ অবশ্য ভালো রেজাল্টের তাগিদে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। লগডাউনের তৃতীয় মাসে পদার্পনে ছাত্র-ছাত্রীদের খবর নিলে জানা যায়, বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীরা ভার্চ্যুয়াল জগতের সাথে সময় পার করছে। অভিভাবকদের চাপ থাকলেও নিজেদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে।


লকডাউনকালীন ছাত্রদের সিডিউল লক্ষ্য করতে গেলে দেখা যায়, ঘুম থেকে উঠছে ১১/১২ টায, কেউ হয়তো রোজা রাখছে কেউ নয়, উঠার পর ইন্টারনেট ব্রাউজিং শুরু, বিভিন্ন সাইট ব্রাউজিং এর পর খাবার গোসলে সন্ধ্যা প্রায়, সন্ধায় যারা রোজা রাখে ইফতার করে, সন্ধার পর অভিভাবকের চাপে হয়তো ঘন্টাখানেক বসা হয়, তারপর খোজ চলে এলাকার আড্ডায়। লকডাউনের কারনে অবশ্য বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেযাও নিরাপদ নয়, তাই কাছাকাছি আড্ডার পর বাসায ফেরার পর আবার ইন্টার্নেটে ব্রাউজিং চলে, রাতে কিছু খেয়ে না খেয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে ব্রাউজিং, এভাবে একই সময়ের পুনরাবৃত্তি চলে অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের। আর ছাত্রীদের বেলায় এখন লক্ষ্য করা যায়, বিভিন্ন সিরিয়াল আর ওয়েব সিরিজের মুখস্তের পালা চলে (ওয়েব সিরিজ অবশ্য সর্বত্র ছড়ায়নি)। ছেলেরা একটু হলে বের হতে পারলেও মেয়েরা মেয়েরা একেবারে ঘরবন্দী।


সারা বিশ্ব ঘরের ভিতর ঢুকে যাওয়ায় বিশ্বকে দেখা যায় স্যাটেলাইটে। ছোট বড় সবার চোখ এখন টেলিভিশন পর্দার উপর। শিক্ষা, বিনোদন, খবর দেখেই অতিবাহিত হয় সিংহভাগের সময়। পরিবারের সবাই ঘরের ভিতর অবস্থান করায় প্রায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে, আমরাই মনে হয় বেশি খারাপ আছি! আমার ছেলে মেয়েটাই মনে হয় পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে গেছে, সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট মনে হয় আমার ছেলেটারই হবে, এসব বিভিন্ন চিন্তায় সময় পার করছেন অভিভাবকরা। আবার যারা পড়াশোনা পরবর্তী সময়ের চাকরীর প্রস্তুতির পড়াশোনা করে, তাদের জন্য একটু ভালো হয়েছে, সারাদিন ঘরে থাকছে এবং পড়াশোনার সাথেই থাকছে।


কিছু ছাত্র-ছাত্রী অনেক কাছ থেকে পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতির রূপ দেখতে পারছে। বাবা মায়ের সঙ্কটের জায়গা উপলব্ধি করছে। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে ভেঙ্গে পরেছে, নিজেদের বাবাকে দেখছে ত্রানের জন্য দৌড়াচ্ছে, বাড়িতে সরকারী মোটা চাউলের ভাত রান্না হচ্ছে, বাবাকে অল্পমূল্যের জিনিসের লম্বালাইনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অনেকে হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়ছে। মস্তিস্কে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, দেশের বেকার সংখ্যা ও পারিবারিক সঙ্কট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর পারিবারিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠে আবার ক্লাসে মনোযােগী হওয়া এখন ভাবনার বিষয়। অনেকের হয়তো পারিবারিক টানাপোড়ানে নিজেদের ছাত্র অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না।


মহামারী করোনার ফলে ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের চাহিদা ব্যাপক ভাবে বেড়ে চলেছে। ঘরে বসে অনেকে ইউটিউবিং, ফ্রিলান্সিং করে সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছে। অনেকে অনলাইন কোর্সে মনোনিবেশ করেছেন। লকডাউনে স্যাটেলাইট ব্যবসায় নতুন গতি যোগ করেছে। ঘরবন্দি ছেলেমেয়েদের একমাত্র সময়ের সাথী এই স্যাটেলাইট।


সময় গড়াচ্ছে আর করোনার ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামনে ঈদ উপলক্ষে অনেক কিছু স্বাভাবিক করে দেয়ার কথা চলছিল, কিন্তু রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে সবার মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে চলেছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। অনুমান করা যায় না কবে প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের নিজস্ব কার্যক্রম শুরু করতে পারবে, এমতাবস্তায় ছাত্রদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কালের দিকে অতিবাহিত হচ্ছে। ছাত্রদের এবছরের কার্যক্রম বেশিরভাগ সময়ই বিফলে পতিত হচ্ছে। বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো পার হয়ে যাচ্ছে ছাত্রদের জন্য, এই ক্ষতি পূরনে পরবর্তীতে কতটুকু কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে তা পরিস্থিতি বলে দিবে। এসময় আরো কিছু দিন চলতে ধাকলে হয়তো অনেকে ভুলেই যাবে তাদের স্বীয় পরিচয়ের কথা। এই কঠোর পরিস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কতোটা স্বাভাবিক রাখা যায় তা সময়ের দাবি! 

Thursday, May 14, 2020

May 14, 2020

বাড়ছে করোনার ঝুকি ভাঙছে সাধারন শিক্ষকদের মেরুদন্ড

বাড়ছে করোনার ঝুকি ভাঙছে সাধারন শিক্ষকদের মেরুদন্ড


            



জাতির মেরুদন্ড গড়ার কারীগরদের  টান পড়ছে নিজেদের মেরুদন্ডে। মেরুদন্ডের ক্যালসিয়াম গুলো জমে যাচ্ছে, হাড়ের মজ্জা শীতল হয়ে যাচ্ছে, নার্ভে জ্ঞান চলাচল কমে যাচ্ছে। আলসে বিশ্রামের প্রতিকূলে সম্ভাব্য সর্বনাশের নীড় গড়ে উঠছে। প্রকৃতিকে আড়াল করে আমাবশ্যার অন্ধকারের তিক্তস্বাদে আসফলিত হয় সাধারন শিক্ষকরা। নদীর এককূলে থাকি অকুল চাহিয়া, কি নিদারুন অপরূপ সৌন্দর্যের প্রশান্তিতে প্রশমিত হওয়া যায়, অতীব নিকটে তা দৃশ্যমান উল্টো। রাখাল বালকের কথা শুনতে যতটা মিষ্ট অনুভুত হয় কার্যে দীঘল ফাড়ি। যার কর্ম যেখানে তার অধ্যষিত নিষ্কন্টক ফল তারই অনুভুতির শ্রেষ্ট পাথেয়। যাদের অনুমেয় প্রতিক্ষায় কালান্তর উজ্জলিত হয় জাতির সীমান্ত চূড়ায়, কিরণ ছড়ায় দিক দিগন্তে, বিকশিত করে হাজারো প্রজ্জলিত আখি, নিমগ্ন করে বিমহীত ভালোবাসায়, প্রকৃতির ছন্দের দোলায় নিমজ্জিত শিক্ষক সমাজ। হেয় প্রতিবিম্ব আলোকবর্তিকার ল্যাম্পপোষ্ট আচমকা ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল হুঙ্কারের সম্মুখীন। আজ বিষয় চক্রে সাধারন শিক্ষকদের আলোকপাত করার চেষ্টায় সংক্ষিপ্ত মতামত প্রতীয়মান করা।


সাধারন শিক্ষক বলতে, যারা নিবন্ধনধারী শিক্ষক নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষাদানের জন্য নিয়োজিত থাকে। সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের মতই পড়াশোনা শেষ করে বা শিক্ষার্থী অবস্থায় নিয়োজিত হন। সরকারী শিক্ষকদের মত সুবিধা ও আরামপদ জীবন এই শ্রেণীর শিক্ষকদের হয় না। তারা স্কুল শেষ করে কোচিং, টিউশনিতে সময় দিয়ে নিজেদেরই যন্ত্র করে তোলে। শিক্ষক যদি হতে চায় কেউ ছাত্র হতে হবে আগে। পড়াতে হলে পড়তে হবে। এই সাধারন শিক্ষকরা অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য বা সংসারের টানাপোড়ানে একটা নাম মাত্র সম্বল হাতে নিয়ে শিক্ষা দান করতে থাকে। তাদের চুক্তিটা থাকে ক্লাস নিলে বিনিময় প্রদান করা হবে আর নাহলে কিছু বলার থাকবে না। আমাদের দেশে সরকারী, আধাসরকারী স্কুলের সংখ্যা খুবই কম, এখন প্রায় এক-দুই কিলোমিটারের মধ্যে স্কুল দেখা যায়, আর শহরগুলিতে তো আরো বেশি স্কুল দেখা যায়। হাজার হাজার বেসরকারী স্কুলে নিবন্ধনধারী শিক্ষক খুব কম, এসব স্কুলে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক বেশি নেয়া হয়। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের বেতন খুব একটা বেশি হয় না, বলতে গেলে আসা যাবার ভাড়াটা দেয়। বাড়তি ইনকামের জন্য টিউশনির বিকল্প কিছু নেই। অনেকে বেসরকারী স্কুলের সাথে লেগে থাকে, স্কুল যদি আধাসরকারী হয়, অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের চাকরিটা পাকাপোক্ত হতে পারে।


হাজার হাজার সাধারন শিক্ষক রয়েছে, যাদের একমাত্র উপার্জন মাধ্যম স্কুলকে কেন্দ্র করে। স্কুল খোলা থাকলে বেতন পাবে, বন্ধ হয়ে গেলে বেতন অর্ধেক হয়ে যাবে। আচমকা মহামারী করোনার প্রভাবে তিন মাস প্রায় স্কুল বন্ধ, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর হচ্ছে, এমতাবস্তায় স্কুল খোলা রাখলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্কুল খোলার কোন সম্ভাবনাই নাই, আর স্কুল না খোলা থাকলে বেসরকারী সাধারন শিক্ষকদের বেতনের তারতম্য হবে, বেতন না পেলে বাস্তব জীবনে নেমে আসবে তিমির অন্ধকার। স্কুল মালিক বা কমিটি তাদের সার্থ হাসিলের পর সাধারন শিক্ষকদের কথা ভাববে। এই অবস্থায় মহামারীর ভয়াবহতা থেকে বাচতে নিরুপায় হয়ে যাচ্ছে কিছু শিক্ষক সমাজ। অনেকে আছে সংসারের দায়িত্ব কাধে নিয়ে তালমাতাল হয়ে পরেছে। ভদ্র পোষাকের নিচে দুঃখটাকে কেন জানি দেখা যায় না, সাধারন মানুষের চোখে তা ধরাও পরে না।


স্কুল বন্ধ হবার পর থেকে স্কুল মালিকদেরও মাথায় একটা চাপ চলে আসে, সারা বছরের মোটা অঙ্কের একটা খরচ ছাত্রদের কাছ থেকে তুলতে হয়, চার পাঁচ মাস যদি স্কুল বন্ধ থাকে সব দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে ছাত্র-ছাত্রী ও স্কুল কর্তীপক্ষ। স্কুল বন্ধের একমাস পর অনেক স্কুল অনলাইন ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তাতে তেমন একটা ফল পাওয়া যায় না। অনেক স্কুল সংক্ষিপ্ত সাজেশন তৈরী করে ছাত্রদের বাড়ী বাড়ী পৌছে দেয়, অনেক স্কুল কিছু শিক্ষকদের নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে। কিন্তু কোন ভাবে ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন আদায় করা সম্ভব হচ্ছেনা। বেতন না তুলতে পারলে শিক্ষকদের বেতন দেয়াও সম্ভব হবে না। আর কয়েকদিন পরেই ঈদুল ফিতর, পরিস্থিতি স্বাভাবিক ধাকলে হয়তো স্কুলের বেতন, অর্ধেক বেতন, টিউশনির টাকা তুলে বউ বাচ্ছা সহ ভালো একটা ঈদ উদযাপন করতে পারতো। এখন সম্ভাব্য কোন পথই খোলা নেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।


এখন বন্ধু মহলে মাষ্টারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, যে বন্ধুটি বেসরকারী স্কুলে কয়েক টাকা বেতনের চাকরি করে তার কথা ভাবতে হয়, ভাবতে হয় তার বউ বাচ্চার কথা, বাবা মায়ের কথা। কেমন করে চলবে বেতন না পেলে। এই সাধারন শিক্ষকগুলোর পারিবারিক, অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো থাকে না। কোন ভালো চাকরি খুজে না পেয়ে অনেকে স্কুলে ধীরে ধীরে জীবন গড়ে তুলে। অনেকের চাকরির বয়স চলে যায়, কোন না কোন জায়গায় টিকে থাকার জন্য স্কুলকে নিরাপদ সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নেন। শিক্ষকশ্রেনীর মানুষ সাধারন মানুষের কাছে কোন সময়ই হাত পাততে পারে না, সমাজে প্রথম শ্রেনীর সম্মান দেয়া হয় শিক্ষকদের, কিন্তু শিক্ষকের হাড়ির খবর কেউ নিতে যায় না। বুক চাপা কান্নায় চেপে রাখে নিজেদের ভদ্র পোষাকের কষ্টটাকে। কবে মহামারী করোনা দেশ থেকে বিদায় নিবে, সব কিছু স্বাভাবিক হবে, ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটে যাবে স্কুলের দিকে, আনন্দে ভরে উঠবে ক্লাস রুম, গুমগুম করবে স্কুলের মাঠ, সাধারন শিক্ষকের মুখে ফুটবে হাসি, পরিবারে আসবে প্রশান্তি সেই কামনায় সকল দুঃখের মালিকের পানে পথ চেয়ে থাকা, কবে মুক্তি দিবা!






Wednesday, May 13, 2020

May 13, 2020

রাতের পরীদের জীবন সঙ্কটে মহামারী করোনার প্রভাব


রাতের পরীদের জীবন সঙ্কটে মহামারী করোনার প্রভাব


নীলিমার দ্বিপ্রহরের আলো ছড়িয়ে ছোছনাকে আড়াল করে দিয়ে একপশরা আমাবশ্যার ছায়া নিয়ে বিনিদ্র রজনী কোন অজানা প্রান পুরুষের হৃদয় আন্দোলিত করে নিজেদের জীবনচক্র অতিবাহিত করে, মেঘমল্লার ঝঞ্জার নিয়ে, আলোর প্রখরতা কাটিয়ে, আগুনের ফুলকির রুপে উদীয়মান জীবন কর্মীরাই রাতের পরী। নিজেদের পণ্য বানিয়ে ভোক্তাদের কাছে নিজেদের স্বপে দিয়ে উপার্জন করতে হয় এই পরীদের। অজানা পুরুষের একনিমেষের সুখের কারীগর এই রাতের পরীরা। এদের কে শুদ্ধ বাংলায় পতিতা বলেই আখ্যায়িত করা হয়। এদের জীবন অত্যন্ত কঠিন এবং মানবেতর। কারো কারো জীবন চিত্র এতটাই কষ্টদায়ক যে, কোন জল্লাদ শ্রবন করার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারবে না। আমাদের দেশে বৃটিশ শাসনামলের সময় থেকে পতিতা বৃত্তি চালু রয়েছে। আমাদেে দেশে প্রায় চৌদ্দটির মত পতিতালয় আছে। এগুলো বড় বড় জেলা শহরে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিমালিকানা ছোট পরিসরে পতিতাবৃত্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় চাপে অনেকবার বিভিন্ন পতিতালয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরে আবার সরকারী সহযোগীতায় এগুলো আবার চালু করে দেয়া হয়। এগুলো পতিতালয়গুলো জনসাধারনের আনাগোনা আছে এমন জায়গায গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো বানিজ্যিক এলাকাগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। বিভিন্ন ঘাট, স্থল বন্দর, নৌ বন্দর, রেল স্টেশনের পাশে গড়ে উঠেছে।

মহামারী করোনা আমাবস্যার মত দেশে ছড়িয়ে পড়লো, আস্তে আস্তে দেশের অনেক বানিজ্য বন্ধ হতে লাগলো, লোক সমাগম বন্ধ করে দেয়া হলো, মানুষকে ঘরবন্দি থাকতে বলা হলো, নিরাপদ দুরুত্বে থাকতে বলা হলো, মেলামেশা থেকে বিরতি থাকতে বলা হলো, আস্তে আস্তে অন্ধকার নামতে লাগলো রাতের পরীদের উপর। এরা দেহ বিক্রি করা উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবনযাপন করে। জীবনের সাড়ে তের ঘাট পাড়ি দিয়ে এ পেশায় কাজ করতে হয়। প্রতিটা সময় বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা আর অনিশ্চয়তার উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়। তাদের জীবনটা পদ্ম পাতার পানির মত, চিরায়ত সবুজের মাঝে এক কণা শিশির বিন্দুর মত। যতদিন যৌবন আছে ততদিন কামিয়ে দেয় মহাজনদের, পরে পরিনত হয় অনিশ্চিত জীবনে।

রাতের নির্মল পরীদের কোন সামাজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। তাদের মত করে নিজেদের তৈরি সমাজবদ্ধ জীবন পার করে। পতিতালয় বা দেহ ব্যবসায় কাজ করে এরা জীবনের সঙ্কটাপন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে এই জায়গায় এসে দ্বারায়। নিজেদের আসল পরিচয় কখনও এরা প্রকাশ করে না। একটা পর্যায় জীবন বাস্তবতার প্রতি এমন ঘৃণা জন্মায় যে পরে সমাজে ফিরে আসতে চায় না, সেখানেই নিজেকে বিকিয়ে দেওয়ার কাজটা মেনে নেয়। সর্বত্র দুনিয়া জুড়ে মহামারীর মধ্যে কিভাবে চলবে এই সম্প্রদায় টিকে থাকবে তা চিন্তা করা উচিত। সর্দানিদের অন্তর্ভুক্ত শত শত যৌন কর্মীর কপালে প্রতিদিন দেহ বিক্রি করতে পারলে ভালো কিছু জোটে আর খোদ্দের না ধরতে পারলে কপালে নেমে আসে অসার দুঃখ মাখা মুহূর্ত। খুবই চেলেঞ্জিং একটা জীবন, এখানে এরা প্রতি মুহূর্তে, প্রতি দিনে সংগ্রামের সাথে টিকে থাকে। করোনা ফলে ব্যবসা বানিজ্য বন্ধ দু'মাস ছাড়িয়েছে। দু'মাস তিন বেলা খাবার চারটি খানি কথা না। কর্মীদের সর্দানীরা কতদিন বসিয়ে বসিয়ে পালবে! এদের জীবন যাত্রা এখন হুমকির মুখে সম্মুখীন। যাদের ঘরে দু'একটা তাগড়া টসটসে কর্মী আছে তারা ভদ্র সমাজে হোম ডেলিভারী সার্ভিস দিয়ে কোন মত টিকে আছে। যেহেতু করোনা রোগটি একেবারেই ছোয়াচে তাই খদ্দেরও এদের দিকে ভিরছে না।

যৌন পল্লীগুলোতে প্রায় অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এরা কোথায় কার কাছে গিয়ে দাড়াবে। সাধারন মানুষতো ক্ষুদার জালা সহ্য করতে না পেরে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দাড়াচ্ছে, কিন্তু যৌনকর্মীরা কার কাছে গিয়ে দাড়াবে, কাকে বলবে আমি ক্ষুদার্থ আমায় খেতে দাও, কাকে বলবে আমার সন্তান দুইদিন ধরে না খেয়ে আছে একটু ওর মুখে খাবার তুলে দিন, কাকে বলবে আমার জড়ায়ু আর পাকস্থলির জন্য ওষুধ খেতে হয় আমায় কিছু টাকা দাও আমি ওষুধ খাব। এরা চাইলেও কথাগুলো সমাজের লোকদের বলতে পারে না, বললেও সমাজের লোকেরা এদের মেনে নিতে পারে না। কারো কাছে কিছু চাইতে গেলে শুনতে তোরা তো বেশ্যা, তোদের দিয়ে কি হবে! তোদের তো সমাজও পছন্দ করে না আল্লাহ ও পছন্দ করে না, গরীব মানুষরে দিলে দোয়া করবো, সেই দোয়া কাজে লাগবো। অথচ এই সমাজের মানুষগুলোই কিন্তু এদেরকে যুগের পর যুগ পতিতা বানিয়ে আসছে, এদেরকে নিবন্ধন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে পতিতা হিসেবে। আজকে যে বেশ্যা বলে পতিতাদের দূরে সরিয়ে রাখছে, তাদের মধ্যেই কিন্তু অনেকে এদের দোয়ারে যেয়ে ধন্যা দিত, একটু সুখ দে! বাড়ির বউয়ের কাছে সুখ পাই না! একটু আদর দিয়ে আমার সব জ্বালা ভুলিয়ে দে, এসব কথা বলে বিছানায় ঝাপিয়ে পরতো, সেই কাঙ্খিত সুখ নিয়ে দু'শ পাঁচশ ধরিয়ে দিয়ে চলে আসতো। অনেক আবার দেখা যেত বউয়ের জন্য কোন দিন শাড়ি কাপড় কিনে আনে না, কিন্তু রাতের পরীগুলোর জন্য কাপড়, চূড়ী, কসমেটিকস নিয়ে সুখের কাঙাল হয়ে পাড়িজমায়।

আজকের এই দুর্দিনে কেউ যদি তাদের কে সাহায্যও করতে যায়, সমাজ থেকে নির্দিধায় বলে যায়- এই লোক বেশ্যাদের সাহায্য করে, এই লোক খারাপ। যৌন পল্লীগুলোতে চড়া দামের চাঁদা, সুদ, ঘোষ লেগেই থাকে। সব সময় একটা অরাজকতা বিরাজ করে, সুদখোর মহাজনরা চড়া সুদের জন্য মাথার উপরে দাড়িয়ে থাকে, তাহলে যারা পাওনাদার সুদখোর আছে তারা কি বসে থাকবে টাকা উদ্ধার করতে? তাদের চাপ তারা দিয়েই যাবে, না খেয়ে আছে কি'না তা দেখার সময় নেই। সমাজের কত ভদ্র লোকের আনাগোনা চলতো পল্লীর ভিতরে, কিছু মুহূর্তের সুখের জন্য এদের কাছে ছুটে অনেক। সমাজ থেকে অরাজকতা কমাতে পল্লীগুলো টিকিয়ে রাখতে হয সমাজের মানুষের জন্য। যেভাবে দেশে ধর্ষন, মাদক অবাধে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে, তা বেড়ে গেলে আর লাগাম টেনে ধরা যাবে না। সমাজকে টিকিযে রাখার জন্য টিকিয়ে রাখা হয় রাতের পরীদের যৌন পল্লী গুলো, সমাজের মানুষগুলোর জন্য গড়ে তোলা হয় পল্লীগুলো, এখনতো পল্লী টিকিয়ে রাখতে হলে পল্লীর মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে, রাতের পরীদের বাচিয়ে রাখতে হবে, এদের সহযোগীতা করতে সমাজের মানুষেরই এগিয়ে আসা উচিত, তারাও তো মানুষ, তারাও তো আমাদের বোন, তাদেরও তো আমাদের মত সন্তান আছে, তাদেরও অধিকার আছে দেশের নাগরিক হিসেবে, তারাও তো তাদের দেহ বিক্রি করা টাকা দিয়ে ট্যাক্স পরিশোধ করে। কেউ হয়তো জানে না মহামারী করোনার ভয়াবহতা কতদূর যাবে, তাই মানুষ হিসেবে মানুষ গুলোকেই এগিয়ে আসা উচিত। রাতের পরীরা তাকিয়ে আকাশের পানে, কবে সুদিন আসবে, কবে খদ্দেরে ভরে উঠবে তার ঘর, কবে সুদের টাকাটা পরিশোধ করবে, আবার বাচ্চাদের মুখে দু'বেলা ভাত তুলে দিতে পারবে, আকাশের মালিক কবে তাদের দিকে ফিরে তাকাবে!

Tuesday, May 12, 2020

May 12, 2020

মহামারী করোনায় বিদায় গৃহকর্মী, ঘরোয়া করলো অনেক দুলালীকে


মহামারী করোনায় বিদায় গৃহকর্মী, ঘরোয়া করলো অনেক দুলালীকে


আড়ম্বরপূর্ণ নিত্য দিনে বিলাসবহুল জীবন চলছিল একশ্রেণীর দুলাল-দুলালীদের। যারা খাবারটা নিজের হাত দিয়ে তুলে খাওয়া ছাড়া ঘরের অন্য সব কাজ বাড়ীর গৃহকর্মীরাই করে দিত। কাপড় কাচা, ঘর মুছা, রান্না করা, টয়লেট পরিষ্কার করা, খাবার দেয়া, থালা বাসন পরিষ্কার করা, বাচ্চা পালন, ঘর গুছানো, বাজার করা, ময়লা ফেলা ইত্যাদি ঘরের যাবতীয় কাজ প্রতিদিন করতে হয়। নিজেদেরকে দেখাশোনা করার জন্য ঘরে বাইরে কেয়ার টেকার সর্বদা কাজের জন্য অপেক্ষা করতো। ভাগ্যিস বিছানার কাজটা কাউকে করে দিতে বলে না। এখন মানুষ এতটাই উন্নত জীবন যাপন করে যে, অনেকে টয়লেট করার পর নিজের হাত দিয়ে পানি ব্যবহার করে না, অত্যাধুনিক কমোডই সেই কাজটা করে দেয়। নিজেদের শুধু কষ্ট করে ছাড়তে হয়। প্রতিদিন ফ্লোর, টয়লেট, রান্নাঘর পরিষ্কার আবশ্যকীয় কর্ম ছিল। নিজেদের মনে হয় গরম পানিটা পর্যন্ত রান্না করে খেতে হয়নি। সকল রান্না করার জন্য গৃহকর্মীরা তো ছিলই। এরই মধ্যে চলে আসলো শতবছরের আরাম ভঙ্গকারী ছোয়াচে মহামারী করোনা। যেখানে নিজের হাতেরই বিশ্বাস নেই, অন্যের হাতকে কি বিশ্বাস করবে। আতঙ্ক শুরু হলো বাড়ির মালিক আর গৃহকর্মীদের মাঝে। সবারই তো জীবনের মায়া আছে! একদিকে বাড়ির বিভিন্ন কাজে বাড়ীর বাইরে যেতে হয় গৃহকর্মীদের, অপর দিকে বাড়ীর মালিকদেরও অনেক কাজে বাইরে মানুষের সাথে মিশতে হয়, কে জানে কার শরীরে ভাইরাস বহন করে ঘরে নিয়ে আসে। পরে হবে এক জগাঘন্টা। সেই জন্য পরিস্থিতি বিপদজনক হওয়ার আগেই প্রায় অনেক গৃহকর্মীকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়, সেই সাথে এক মহা বিড়ম্বনায় পরতে হয় অনেক দুলাল-দুলালীদের।

যেখানে প্রতিবেলায় রান্না হতো পাঁচ ছয় প্রকারের খাবার, এখন ডিম ভাজি আর আলু সিদ্ধ খেয়েই বেচে থাকতে হচ্ছে। দিন দিন করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে, রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে, মানুষের মধ্যে ভয়ও কাজ করছে। বিপদ হয়েছে দুলালীদের, যারা আলতা মাখা পায় বসে বসে ফ্যাশনশো করতো, পায়ের উপর পা তুলে শুধু অর্ডার করতো। বাবা মার বাড়ীতে তো জীবনে রান্না-বান্না শিখেই নি, জামাইয়ের ঘরেও তেমন রান্না করতে হয় না। লকডাউনের ফলে একটা আছোলা বাঁশ খেয়ে গেল দুলালীরা, ঘরে স্বামী সন্তানসহ বন্দি একটা অবস্থা, এখনতো বাজতে হবে! ভাগ্য ভালো ইউটিউব বাবাজি আছে! যেখানে সন্তান জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে কবরে শোয়ানি পর্যন্ত সকল কাজের টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। এখন ইউটিউব থেকে দেখে দেখে ডিম ভাজি শিখতে হয়, তাও লবন একটু কম বেশি হয়ে যায়। ভাত রান্নার জন্য কতটুকু পানি দিতে হয়, আলু সিদ্ধয় কতটুকু পানি দিতে হয়, আরো কত টেনশন। খাবার পর তো কোন সময় থালা ধুয়ে অভ্যাস নেই, এ কাজটা এসে পরেছে দুলাল সাহেবদের উপরে। কি আর করার বউ যখন জলে নেমেছে স্বামীকে তো নামতে হবেই।

এমন কোন দিন নেই, যেদিন ফ্লোর মুছা, টয়লেট পরিষ্কার করা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা নিয়ে রহিমার মা'কে কথা শুনতে হয়নি! আব্দুলের বাপও ছার পায় নি বাজার করা নিয়ে কথা শুনতে। এখন এসব কাজ নিজেদেরই করতে হয়। দুলালী বউ একদিন ফ্লোর মুছতে যেয়ে পরেরদিন থেকে সর্দি বাধিয়ে বসে আছে, রান্না করতে যেয়ে ঘেমে সর্দি আরো বেড়ে যায়, শুরু হয় গলাব্যথা, মাথাব্যথা আরো কত ঢঙ। এবার ঘরের সকল দায়িত্ব এসে পড়লো দুলাল বাবাজিদের কাধে, চৌধুরি সাহেবের ছেলে করবে রান্না-বান্না, ইউটিউব দেখে কোন মত ঘেটে ঘুটে কিছু আলুর দম রান্না করে খাচ্ছে পরিবার মিলে। এখন রান্না-বান্না তো কোন মতে চলছে,  এগুলো পরিষ্কার করে কে? দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে রান্না ঘরে, টয়লেট, ডাইনিং রুমে। দু'দিন না যেতেই দুলাল সাহেবেরও পানি নেরে জ্বর সর্দি বেধে যায়। আর যাবে কোথায! দুজনের মনেই কতো সন্দেহ, তাদেরই করোনা হলো কি'না, কত দুঃচিন্তা!

এই মহামারী করোনায় প্রায়ই দেখা যায় কিছু মহিলা জীবনে রান্না করেনি, যা'ই রান্না করুক না কেন, সেটাই ফেসবুকে আপলোড। নতুন নতুন রেসিপি শিখছে, রেসিপি করতে যেয়ে সারাদিন পার, এদিকে উপোস থাকতে হয় দুজনকেই। সাধের রেসিপি করার পরেই আগে সেলফি তুলে আপলোড, স্টেটাস দিচ্ছে প্রিয়তমর জন্য রান্না করেছে, পরে খাবার সময় দেখা যায়, কালারটা সুন্দর হয়েছে কিন্তু লবনটা'ই দিতে ভুলে গেছে। গেল, সারাটা দিন মাটি গেল! মুখগুলো তখন খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

কাজের লোককে করোনা জনিত কারনে ছুটি দেওয়ায় নিজেদেরই রাজারে যেয়ে বাজার করতে হয়, আগে তো গফুর চাচা বাজার করলে কত কিছুর ভুল ধরা হতো, এখন নিজেরা যেয়ে পচা-গন্ধ যা পায় তা'ই নিয়ে আসতে হয়। বাসায় যেভাবে চিন্তা করা যায়,৷ বাজারে এরকম ফল পাওয়া যায়না! আকাশের মালিকের কি বিচার! চারদিকে যখন অত্যাচার, ব্যাভিচার বেরেই চলেছে তখন নিজ হাতে তার সমতা আনার জন্য কি মহামারী করোনা পাঠালেন। পেপার পত্রিকা খুললেই দেখা যেত গৃহকর্মীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষন, হাত পুড়িয়ে দেয়া, গায়ে ছেকা দেয়া আরো কত কি! এই মহামারীতে সেই সকল মালিককে চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে গৃহকর্মীদের কষ্ট অনুভব করার, তাদের প্রতি সহমর্মিতা করার, সবার মধ্যে মানসিকতা বোধ তৈরি করার। সবাইকে এক কাতারে আসার মহান শিক্ষা এই ভয়াবহ করোনার মহামারীতে জানান দিয়ে যাচ্ছে, ধ্বনিত হচ্ছে সকল মানুষ এক হও, মানুষের কল্যানে এগিয়ে যাও।

Monday, May 11, 2020

May 11, 2020

লোক শিল্পীদের সামাজিক অবক্ষয়; প্রেক্ষিত- করোনা পরিস্থিতি


লোক শিল্পীদের সামাজিক অবক্ষয়; প্রেক্ষিত- করোনা পরিস্থিতি



গ্রাম বাংলায় যারা লোক কথা, লোক গাথা, লোক কাহিনী, লোক সুর, লোক কর্ম, লোক মানুষের জীবন চিত্র নিয়ে কাজ করে তারাই লোক শিল্পী। এর মধ্যে যারা লোক গান করে, লোক পালা যারা করে, লোক নাট্য যারা করে, লোক নৃত্য যারা করে, লোক আলেখ্য যারা করে, ঐতিহ্যবাহী যাত্রা যারা করে, লোক বাদ্য যারা বাজায় ইত্যাদি লোক শিল্পীর আওতাভুক্ত। এছাড়াও লোকজ সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত যারা আছে, তারাও লোক শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। তাদের জীবন ধারা খুবই সহজ সাধারন। তাদের মতে, ' সহজ খাই, সহজ থাকি, সহজ চলি, সহজ যাই, সহজ পুরো জীবনটাই।' তাদের জীবন ধারনের মধ্যে লোকজ শিল্প চর্চ্চার পাশাপাশি কেউ কেউ ক্ষেতে খামারে কাজ করে, কেউ চাষাবাদ করে, কেউ জেলে, কেউ তাতী, কেউ কুমার, কারো ছোট ব্যবসা আছে, কেউ রিক্সা চালায় ইত্যাদি। তারাই হচ্ছে মূল লোক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। উত্তরাধীকার পরম্পরায় ও গুরু পরম্পরায় তারা লোক সম্পদগুলো বহন করে, লালন করে এবং পালন করে। 

লোকজ সম্পদগুলো লোক শিল্পীদের প্রানের স্পন্দন। যে যে কাজই করুক না কেন দিন শেষে বাদ্য নিয়ে বসে একটু গুন গুন করবেই। নিজের মত গান বাধবে, কাহিনী বাধবে, নাচ তুলবে, নতুন পাঠ করবে ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে লোক শিল্পীদের কর্ম প্রদর্শন, চর্চা, শিক্ষাদান কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তির যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে, মিডিয়ার অত্যাধনিক প্রসারনায় শিল্পগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন লোকজ শিল্পের জায়গায় প্রাশ্চাত্য শিল্প জায়গা করে নিচ্ছে। তা'ই অনেক শিল্প বিলুপ্তিই প্রায়। যার ফলে যারা গুরু পরম্পরায় লোক শিল্প চর্চা করে আসছে তাদের মধ্যে অনেকে যুগের স্রোতে গাঁ ভাসিয়েছে, কেউ আদি শিল্প নিয়ে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে, কেউ বা বিলুপ্তির পথে।



লোক শিল্পীদের যারা যেখানেই আছে তারা খুব একটা ভালো নেই। তারা এই শিল্প গুলোর সাথে সম্পৃক্ত হবার পর থেকেই 
বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যারা উত্তরাধীকার পরম্পরায় চর্চা চালিয়ে তারা কিছুটা কম সামাজিক কটুক্তি গুলোর সম্মুখীন হয়, যারা গুরু পরম্পরায এ শিল্প চালিয়ে আসছে তারা মা-বাবার কাছে, বউয়ের কাছে শ্বশুরবাড়ীর লোকের কাছে, গুরুজনদের কাছে, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে রঙ-বেরঙের কথা শুনে শুনে শিল্প চর্চা চালিয়ে আসতে হয়। এই শিল্পের যে কি স্বাদ, কি মাহাত্ত্ব, কি অনুভূতি, কি মায়া, কি প্রেম, কি ভালোবাসা যারা চর্চা করে এবং যারা এর দর্শক, যাদের অমৃত আস্বাদনের ক্ষমতা আছে তারা এ শিল্পগুলির ক্বদর জানেন। সমাজে হরহামেশাই দেখা যায় কেউ যদি লোকজ পালা নাট্য গুলোর সাথে কাজ করে, এর জন্য কত যে কথার স্বীকার হতে হয়, তা বলা বাহুল্য, মায়ের কাছ থেকে শুরু হয়- 'কি সব করছ, ঘাটুদের মত সাইজা নাচ গান করছ, নাচনেওয়ালী সাজছস?', বাপের কাছে শুনতে হয়- 'ছেলে মানুষ কি মেয়ে সাইজা নাচে? আমি এক নর্তকী পালতাছি!', বউয়ের কাছে শুনতে হয়-' তুমি এরকম হাফলেডিস সাইজা নাচ, গান করো, মাইনসে দেখলে কি কয়?', বন্ধু বান্ধবের কাছে শুনতে হয়- 'কিরে মাইগ্গা আবার কবে ডেন্স মারবি?', মুরুব্বিদের কাছে শুনতে হয়- 'দোজখে যাইবি দোজখে, গান বাজনা নাটক কাজ হবে না!'। এরকম প্রত্যেকটা লোকজ শিল্পীর হাজার রকম কথা শুনে শুনে আসতে হয়।

এই শিল্প ভান্ডারের সারথীরা চলমান করোনা মহামারীতে কি অবস্থায় আছে,  সাধারন মানুষ কি তাদের খোজ নিচ্ছে? সমাজপতিরা কি তাদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে? এই স্বশিক্ষায় শিক্ষিত লোক শিল্পগোষ্টীদের প্রতি কি সমাজের সদয় দৃষ্টি আছে? থাকলে ভালো! এইশ্রেনীর মানুষ গুলাই আপনার, আমার বাপের নিজস্ব লোক সম্পদগুলো বহন করে বেরাচ্ছে। আর আমরা তো হাওলাত করা শিল্প নিয়ে লাফালাফি করে যাচ্ছি। এরা সমাজের নিগূঢ় ত্বত্তের দার্শনিক, এদের চোখেই সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিপীরণ, অত্যাচার, দোষ ধরা পরে, সেগুলীকে আবার সুন্দর করে উপমা দিয়ে শিল্প তৈরি করে।


লোক শিল্পীদের মধ্যে যারা বাদ্যযন্ত্র বাজায়, তাদের এটা বাজিয়েই সংসার চালায় বেশিরভাগ, অন্যান্য অনেক শিল্পীর আয়ের উৎস বাড়ি বাড়ি যেয়ে বাউল গান, বৈঠকি গান, বিচার গান, পালা গান, কবি গান, ঘাটু গান, ধামাইল গান, কিচ্ছা পালা, গম্ভীরা, আলকাপ, মাদারপীরের গান, সত্য পীরের গান, দত্ত গান, শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন, রামায়ন গান, মঙ্গরকাব্য, অষ্টক গান, জারি গান, কালীর নাচ, আদিবাসী নাচ, যাত্রাপালা ইত্যাদি করে জীবন যাপন করে। করোনার এই সঙ্কটময় অবস্থায় এই শিল্পীদের খোজ যদি কেউ না নেয়, তবে এ সম্প্রদায় কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে কিছু মেয়ে বাউল গান, যাত্রাপালা বিভিন্ন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত আছে, যারা এটা করে পরিবারকে কিছু সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মানুষ এই শিল্পীগুলোকে বাজারী মেয়ে হিসেবেই জানে। এখনও একটা প্রথা দেখা যায়, বিয়ের পাত্রী যদি গান, নাচ, নাটকের শিল্পী হয় তবে তাকে একহাড়ী হাজারটা কথা শুনতে হবে, সর্বশেষে একটা বাজারে মেয়ে হিসেবে পরিগনিত করবে।

এই মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে লোক সম্পদগুলোকে যদি টিকিয়ে রাখা না যায়,  তবে পরবর্তীতে লোক শিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে, শিল্পীদের জীবন হয়ে উঠবে অনিরাপদ। শহর এলাকার কিছু সচ্ছল শিল্পী থাকলে গ্রামের দিকে পুরোটাই বিপরীত। প্রত্যেক থানা শহরে এখন কিছু সংখ্যক লোক শিল্পী সমাজ খুজে পাওয়া যাবে। মহাজনরা যদি সদয় দৃষ্টি দেন এই ক্ষুদ্র লোক গোষ্টীর দিকে, তাহলে করোনা পরবর্তী সময়ে লোক শিল্প আবার খুজে পাবে তরুন প্রান। বেচে থাকবে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী লোক শিল্প।

Sunday, May 10, 2020

May 10, 2020

মা দিবস ও সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা


মা দিবস ও সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা


এক অটুট অবিচ্ছেদ্দ তুলনাহীন সম্পর্কের নাম মা, একচেটিয়া ক্রেডিট ভালবাসার নাম মা, এক বুক ভাটা কষ্টের মাঝে এক প্রাচীরের নাম মা, এক স্নিগ্ধ কোমল ভালোবাসার নাম মা। মা, সে এক ঐশ্বরিক সৃষ্টির অদ্বিতীয় ভালোবাসা। আর এই মা'কে আন্তর্জাতিক ভাবে একটি দিন সম্মান প্রদর্শন করাই মাতৃ দিবস বা মাদার্স ডে। মা'কে ভালবাসার ও সম্মান করার জন্য একটি দিনে কি তার ঋন শোধ করা সম্ভব! মায়ের কোমল ভালোবাসার সম্মান কি এক দিনে দেয়া সম্ভব। ভালবাসা রইলো সেই সকল মায়েদের, যারা বৃদ্ধাশ্রমে বসে ছেলের মঙ্গল কামনা করছে। শ্রদ্ধা জানাই যারা ছেলেমেয়ে থাকতেও এখনও নিজেরা কাজ করে চলছেন।

মা শব্দটি সকল দেশে, সকল ধর্মে, সকল সভ্যতায় নিরন্তর শ্রদ্ধার জায়গা। প্রাচীন গ্রীসে সর্বপ্রথম মা কে সম্মান জানানোর জন্য বাবা দিবসের ন্যায় মায়ের প্রতি ভালােবাসার মাদারিং সানডে চালু করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময় মাদারিং সানডে চালু হয়েছে। প্রায় বেশিরভাগ দেশে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত দিনে পালন করা হয়ে থাকে। চীন সহ অন্যান্য দেশে এ দিবসটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া সকল ধর্মেও মায়েদের জায়গা শ্রদ্ধার অতলস্পর্শে। ক্যাথলিক ধর্মে মেরিকে, হিন্দু ধর্মে মাতা তীর্থ অতসী ও মুসলমান ধর্মে হযরত মোহাম্মদ (স:) এর কন্যা হযরত ফাতিমাকে মা হিসেবে স্বরন করা হয়।

মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আরেক বহি:প্রকাশ দেখা যায় মেক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটিতে। এটা সারা বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত বই। ভালবাসা ও সমাজবাস্তবতার গভীর মেলবন্ধন লক্ষ করা যায় এতে। এক মায়ের এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তা 'মা' উপন্যাস না পড়লে উপলব্ধি করা দুষ্কর। এ উপন্যাসটি এতো জনপ্রিয় হয়েছে যে পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হয়েছে। আমাদের দেশেও এই বইটি খুবই জনপ্রিয় একটি বই।


মা তার সন্তানকে এবং সন্তান তার মা'কে কতটুকু ভালোবাসে তা তারা নিজেদের উপলব্ধিতেই বোঝেন। মায়ের প্রতি ভালোবাসার বহি:প্রকাশ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এমন অনেক আছে যারা মা'কে অনেক ভালোবাসে কিন্তু কখনও বলাই হয় না, মা তোমাকে অনেক ভালোবাসী, আবার কেউ মুখে বলতেছে মা তোমাকে একমাত্র আমিই ভালোবাসী! অন্যদিকে তার চিন্তা কাজ করে- তোমার নামে যে সম্পত্তি আছে তা আমায় লিখে দিও। মা এবং সন্তানের মধ্যে কেউ আবার সার্থও খুজে বেড়ান। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিস্তারের ফলে কুলাঙ্গার সন্তানের দেখা মেলে। যারা মা সহ দুই ভায়ের পরিবার নিয়ে গাজীপুর শালনায় থাকতেন। তারা মায়ের জ্বর সর্দি, কাশি করোনার কিছু লক্ষন দেখা যাওয়ায় তারা বৃদ্ধ মা কে দুই ভাই টাঙ্গাইলের সখিপুর জঙ্গলে ফেলে চলে যায়। মায়ের বাড়ি ছিল শেরপুর নালিতাবাড়ী। পরে এলাকাবাসী খবর পেয়ে বৃদ্ধ মা কে চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠান, পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় তার করোনা পজেটিভ ছিল না।

মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে মায়েরা কি পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে তা শুধু তারাই জানেন। সন্তান বাইরে গেলে দোয়া করতে থাকে, আমার যাই কিছু হোক আমার সন্তানের যেন কিছু না হয়! বাবা বাসায় বন্দি, আয় রোজগার বন্ধ কিভাবে সংসার চলবে? এর মধ্যে মায়েরা দিব্যি এক ব্যবস্থা করে ফেলে। নিজের রক্ত বিক্রি করে হলেও সন্তানের যেন কোন অভাব বোধ করে সেদিকে তার পূর্ণ চেষ্টা থাকে। সন্তানরা মা বাবা কে ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য দিবস চালু আছে কিন্তু সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের কোন দিবস লাগে না, প্রতিদিন ভোর বেলা থেকে শুরু করে অবিরাম ভালোবাসা চলতেই থাকে। এখন লক্ষ্য করা যায় যে মায়েরা সন্তানদের এতো ভালোবাসে যে, কিছু মা স্কুলে দ্বিতীয় বারের মত ভর্তি হয়, মানে সন্তানদের চোখের আড়াল'ই হতে দেয় না, স্কুলে ভর্তির দিন থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন পর্যন্ত স্কুলে আনা গোনা চলেই। সন্তানের স্কুল দশটায়,  তাকে উঠতে হয় ছয়টায়, নাস্তা তৈরি করো, প্রাইভেটে নিয়ে যাও সাড়ে আটটায়, সেখান থেকে স্কুলে টিফিন সহ দিয়ে আবার চারটায় নিয়ে যেতে হবে কোচিং এ, এরপর বাসায় প্রাইভেটের জন্য তৈরি করা, শুক্র, শনি গানের ক্লাস, নিজের কোন সময় নেই। কিছু মা অন্যরকম হয়ে থাকে, তাদের সন্তানদের যন্ত্রে পরিণত করে, সেই সন্তানের মধ্যে সামাজিকতা, মানসিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ কিছুই খুজে পাওয়া যায় না, এরা পল্ট্রি মুরগীর মত নাক ডুবিয়ে পড়াশোনা আর পড়াশোনা করাতে পছন্দ করে। এই জায়গায় ভালোবাসাটা একটু বেশি পরিলক্ষিত হয়।

মায়েরা যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তোলে, তেমনি একজন সন্তানেরও উচিত তার জন্মদাতা মা'কে উপযুক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা করা। তাদেরকে তাদের অপূরনীয় কষ্টের মূল্য দেয়া এবং শেষ বয়সে সুখের ঠিকানা তৈরী করে দেয়া প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু বাস্তবে তার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় অনেক জায়গায়। সন্তান সাবলম্বী হবার পর দেখা যায় মায়ের সাথে সম্পর্কের বিচ্যুতি ঘটে, মায়ের শেষ কাল হয়ে ওঠে দুঃখ সারসম্পুর্ন। যার ফলে দেশে বৃদ্ধাশ্রমে সদস্য বেড়েই চলেছে। ২০২০ এর আইনে অবশ্য একটি আইন পাশ করা হয়েছে, তা হচ্ছে কোন সন্তান যদি তার মা বাবার দ্বায়ভার না নেয়, তবে সেই সন্তানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

যত দুঃখ, জরাজীর্ন কাটিয়ে মা এবং সন্তানের অটুট বন্ধন গড়ে উঠুক, সকল মায়ের ঘর খুশিতে ভরে উঠুক, সফল হোক মাতৃ দিবস, সকল মায়ের জয় হোক।

Saturday, May 09, 2020

May 09, 2020

মহামারী করোনার কড়াল গ্রাসে মধ্যবিত্তের দিনসমাচার


মহামারী করোনার কড়াল গ্রাসে মধ্যবিত্তের দিনসমাচার 



মুখে হাসি, শান্তি প্রিয়বাসী,
মধ্যবিত্তের এই রূপ বড় সর্বনাশী
না পায় তাদের কুলকিনারা
অল্পতে হয় সপ্নহারা।
পকেটে পাঁচ টাকার দুইটি নোট নিয়ে বুকে হাজারটা সপ্ন নিয়ে বাঁচার নামই মধ্যবিত্ত। যেখানেই ছুটে যাক না কেন, অর্ধেকটা পায়ে হেটে এসে বাকি পথটা পাঁচ টাকা দিয়ে অটো ভাড়া দিয়ে বাড়ী পৌছাবে। নিজের রিক্সাভাড়া বাচিয়ে ছেলের টিফিনের টাকা দেওয়ার নাম মধ্যবিত্ত, মুখে হাসি নিয়ে বুকে কষ্ট নিয়ে ভালো আছি বলার নাম মধ্যবিত্ত। হাজার টাকার শার্ট দুইশত টাকা দিয়ে ফুটপাত থেকে চকচকে শার্ট কিনে পড়ার নাম মধ্যবিত্ত। ছেড়া জুতা বার বার সেলাই করে পড়ার নাম মধ্যবিত্ত। এ মাল গুলো সবার থেকে আলাদা হয়। এদেরকে উচ্চবিত্তদের সাথেও চলতে হয় আবার নিম্নবিত্তদের সাথেও তাল মিলিয়ে চলতে হয়। 

মধ্যবিত্ত পরিবারের এরা ক্রিয়েটিভ অভিনেতা হয়ে থাকে। নিজেদেরকে অন্য মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করে। এদের মুখের রসই থাকে অন্যরকম, কেউ যদি বলে কি খেয়েছেন? এমন ভাবে বলবে যেন সাড়ে তিন তারা হোটেলের প্রথম শ্রেণীর খাবার খেয়ে এসেছে। খেয়েছে কিন্তু আলু ভাজি, ডিম ভাজি আর বাসীপান্তা ভাজা ভাত। এটাকে বলবে পটেটো ফ্রাই, ডিমের দু'পেয়াজার রেজালা, ফ্রাইড রাইস উইথ সস, সাথে রাজস্থানী সালাত। এভাবে বলতে শুনলে যে কারো জিভে জল চলে আসে। খাওয়ার চেয়ে বলায় বেশি রস থাকে এদের। ছেলে-মেয়ের স্কুল কলেজের বেতন দিতে হবে! এমন ভাবে টাকাটা কারো কাছ থেকে যোগার করবে, কাউকে বুঝতেই দিবেনা টাকাটা কোথায় থেকে জোগার করা হয়েছে। ছেলেমেয়ের জন্য টাকা পাঠানোর দরকার হলে নিজের জমি, প্রয়োজনীয় জিনিস বন্ধক রেখেও তবু টাকা পাঠাতে হয়। নিজের সিগারেট খাওয়ার টাকা বাচিয়ে ছেলের হাত খরচের টাকা দিতে হয় এই শ্রেনীর মানুষের। ঘরের একবেলার চাল বাচানোর জন্য প্রায়ই বলতে শোনা যায় বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি, পেট ভরা। এ পরিবারের মায়েদেরই বলতে শোনা যায়, আমি খেয়েছি তোমরা খেয়ে নাও।


হাজার রকম কষ্ট আর হরেক রকম কান্না নিয়ে বেচে থাকতে হয় এই মধ্যবিত্তদের। মহামারী করোনা এই বাংলায় খুটি স্থাপনের ফলে লাক্ষে লাক্ষে মধ্যবিত্তের শুরু হয় বুক ফাটা কান্না। নিম্নবিত্তের মত এরা ত্রানের জন্য দ্বারে দ্বারে দৌড়াতেও পারে না, কারো কাছে হাত'ও পাততে পারে না। সমাজের পরিক্ষীত শুদ্ধ জীব এরা। সরকারী বেসরকারী ছোট চাকরী অথবা ছোট মাঝারি ব্যবসা দিয়ে তাদের সংসার চলে। মোট আয়ের বেশিরভাগ অংশই যায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও মানুষ করার পিছনে। যে ছোট খাটো একটা সঞ্চয় করার সুযোগ হয় তা'ও আবার ছেলেমেয়ের পিছনে খরচ করতে হয়। 

শুরু হয় করোনার মহা প্রলয়, ধীরে ধীরে দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে,  ঘরমুখো হতে থাকে মানুষ, মধ্যবিত্তের গলায় পরে রশি। বাইরে বের হতে পারেনা করোনা পরিস্থিতির জন্য, আবার ঘরের খাবার ফুরিয়ে গেছে ঘরেও থাকতে পারছে না। ঘরের জমানো যা ছিল সেগুলো শেষ দিকে। সরকার মধ্যবিত্তদের দিকে তাকিয়ে অল্প মূল্যের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দেবার ব্যবস্থা করেছে, তা'ও আবার কয়েকটা এলাকার জন্য একটি পয়েন্টে। এই পণ্য গুলো নেবার জন্য এতো বড় লাইন হয় যে, রেললাইনের মত চোখ যতদুর যায় ততবড় লাইন। এ লাইনে দাড়িয়ে থেকে বাবা যখন রেশনের মোটা চাল, পেয়াজ, আলু, মোটা ডাল নিয়ে বাসায় আসে, তখন বাবাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাবা কোথায় গিয়েছিলে? বাবা তখন চট করে হাসি মুখে একটা মস্তবড় মিথ্যা কথা বলে ফেলে, বলে একটু ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়েছিলাম ব্যাংকে অনেক বড় লাইন, পরে টাকা তুলে বাজার করতে একটু দেরি হয়ে গেল। অথচ ব্যাংকের জমানো টাকা দুইমাস আগেই শেষ।

মধ্যবিত্তের মানুষেরা খুনি প্রকৃতির হয়, এরা পরিবারের সবার সপ্নকে প্রতিরাতে গলা টিপে হত্যা করে। প্রথমে সপ্ন ভাঙ্গে বিয়ে করা বউয়ের। একটা মেয়ের কত সপ্ন থাকে,  স্বামীর সাথে কত জায়গায় বেরাতে যাবে, ঘরে কত দামি-দামি আসবাবপত্র থাকবে, সােনাগয়না থাকবে, চারপাঁচটা দাসি-বাদি থাকবে আরো কত কি! বাস্তবে দেখা যায় পাতিলের তলা ঘষতে ঘষতে আর বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করতে করতে দাঁত পরা পাকা চুলের বুড়ি হয়ে যায়। বয়সকালে আর কোথায় যাবে ঘুরতে! ডাক্তারের কাছে আসতে যেতেই এক পা কবরে চলে যায়। ছেলে মেয়ের সপ্ন হত্যা করে এরা, ছোট বেলা শুনে আসে ছেলেমেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে, বাস্তবে দেখা যায় টাকার জন্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সাহসই করতে চায় না বাবা মা। ফলে ছেলেও সেই মধ্যমেই থেকে যায়।

মধ্যবিত্ত পরিবারের এরা পৃথিবীর আসল রূপ দেখতে পায়, মহামারী করোনার বিস্তারের ফলে একমাত্র এরাই না খেয়ে পেট ফাটানোর সাক্ষী হয়ে থাকবে। কষ্ট যে কি ভারী তা একমাত্র এরাই উপলব্ধি করতে পারে। কত রঙের কষ্টের চাদর গায়ে দিয়ে করোনা পরিস্থিতি পার করছে, তা তাদের ভিতরটা খুলে দেখলে তা বুঝা যেত। নিজের ডায়বেটিস আর উচ্চরক্তচাপের ওষুদের টাকা দিয়ে বাজার সদাই করতে, পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। পরিবারকে বাচানোর জন্য নিজের খবরটাই আর রাখা হয় না, সময় হয়না নিজেকে নিয়ে ভাবার। এই মহামারিতে কতটা কষ্ট শিকার করতে হচ্ছে তা দেখতে যাবে কে! উপর দিয়ে তো ভদ্রলোককে সুখিই দেখা যায়। এ করোনাময় পরিস্থিতিতে এখন দেখার বিষয় এই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা কতটুকু যুদ্ধ করে টিকিয়ে রাখতে পারে নিজেদের, বাচিয়ে তুলতে পারে তাদের পরিবারকে, সেই আশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, আকাশের মালিক কোথায় নিয়ে পৌছায় এই মধ্যবিত্তদের!

Friday, May 08, 2020

May 08, 2020

করোনার সংস্পর্শে দারিদ্র ভারে নুইয়ে পড়েছে নিম্নবিত্তের মেরুদন্ড


করোনার সংস্পর্শে দারিদ্র ভারে নুইয়ে পড়েছে নিম্নবৃত্তের মেরুদন্ড 



চলমান দিন যাপনায় কাক ডাকা ভোরের শিহরিত হাওয়ায় গা ভিজিয়ে, আড়াই তারার সুখ বিসর্জন দিয়ে, কাঠপোড়া কয়লার ঘর্ষনে পাটি জোড়াকে খিস্তি দিয়ে টিউবওয়েলের ঐসর্গিক নির্ভেজাল জলে স্নাতো হয়ে রোজকার কাজের জন্য তৈরি হয় নিম্নবিত্ত শ্রেনীর নিরীহ মানুষ গুলি। দিন কয়েক পেয়াজডলা পান্তা কপালে জুটলেও আর্ধেক দিন দুই গ্লাস জলের উপরেই শুরু করতে হয়। মুসুরের ডাল আলু সেদ্ধোর স্পেশাল রেসিপি যেনো মোঘল আমলের মোরগ পোলাও আর কাচ্চিকেও হার মানায়। সারা দিনের পরিশ্রান্ত দেহে যা খায় মেশিনের মতো নিমেশেই হজম হয়ে যায়। উচ্চবিত্তের গ্যাষ্ট্রিক আলসার যেন ছুতেই পারে না। সারাদিন হাড়হাবাতে খাটনীর পর ঘর্মাক্ত দেহে বাড়ী ফেরে। যদি সময় হয় একটু চা'র দোকানের সিনেপ্লেক্সে বসে একটু সময় অতিবাহিত করে নিদ্রায় গমন করে। প্রায় একই সিডিউলে চলতে থাকে রোজকার দিনযাপন।

দিন চুক্তি হিসেবেই নিম্নবিত্ত শ্রেনীর কর্ম সম্পাদিত হয়। যেদিন আয় হয় তার পরের দিন মাছ ভাত জোটে, আর যেদিন কাজ বন্ধ তার পরের দিন জোটে কোন মত নূন ভাত। দিনকার রোজ অল্প আয়ের মাঝে কিছু অংশ যে সঞ্চয় করবে তা আর হয়ে ওঠে না। কিছু পরিবার বাৎসরিক একটা ভালো সময় পার করার জন্য মানে ঈদ বা যে কোন প্রয়োজনে সাপ্তাহিক কিস্তির ঋন নিয়ে থাকে। যার ঘানি টানতে টানতে বৎসর পার, তারপর আবারো সেই ঋনের পুঃনরাবৃত্তি, এসবের মাঝে আর নিজেদের সম্পদ বলে কোন সঞ্চয় হয়ে উঠে না। যা রোজগার হয় তাই দিয়ে আল্লার নাম বলে চলতে থাকে।

এমনি অবস্থায় মহামারী করোনার বিষাক্ত ছোবল পরে আমাদের দেশে। বিস্তার লাভ করতে থাকে আক্রান্ত রোগীর। সারা বিশ্ব প্রায় অচল অবস্থা, এরকই সাথে আমাদের দেশেও অচল হতে থাকে। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কলকারখানা, ব্যবসা-বানিজ্য, যানবাহনসহ সকল কিছু। তার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় নিম্নবিত্তদের আয়ও। অনেকে হয়তো ভেবেছিল সপ্তাহ খানেক পর সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু পরিস্থিতি আরো কঠিনের দিকে যেতে থাকে, ফুরোতে থাকে নিম্নবিত্তের হাড়ির ভাত, চারদিকে সুর বাজতে থাকে ক্ষুদার্থের হাহাকার। দারিদ্রের ঘন্টা যেন আরো জোরে বেজেই চলেছে। সবাই আটকে পরে ঘরে, চলতে থাকে ক্ষুদার্থের তারনা। বেলা বারতে থাকে আর অনাহারী পেটের আর্তনাতও বারতে থাকে। এভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে দিনগুলো আরো কঠিন হয়ে ওঠে বাড়তে থাকে বুক ফাটা কান্না।

করোনা মহামারীর দুঃসময়ে এগিয়ে আসে সরকার সহ অন্যান্য সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। ত্রান বিতরন চলে সাধারন মানুষের মধ্যে,  এর মাঝে কেউ পায় কেউ পায় না। তবে অনেক জায়গায় চেষ্টা ছিল সবার হাতে ত্রান পৌছে দেবার। ত্রান দেয়া হয়েছে সপ্তাহ পনের দিনে একবার তা'ও আবার ৫/১০ কেজি করে। এখন যে বিষয়টি উপলব্ধি করার বিষয় তা হচ্ছে, ৪/৫ জনের পরিবারে পাঁচ কেজি চাল, দুইকেজি আলু কয়দিন চলে? দৈনন্দিন ২/৩ বেলা হাজিরার পেটে খাদ্য না পরলে তো ইঞ্জিন ঠিক রাখা যাবে না। মহামারীর এই সময়টা যেন ডাক্তার রোগীর মত অবস্থায় পরিনত হয়েছে- রোগী ডাক্তারকে বললো স্যার আমার ঘুম হয়না আমি কি করতে পারি? ডাক্তার বলল, কিছু বড়ি দিলাম এগুলো খেয়ে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়বেন। যথারীতি রোগী ওষুধ খেল, যা ঘটলো, ওষুধ খেয়ে রোগী সারারাত বসে রইলো, রোগীর বউ গভীর রাতে স্বামী ঘুমাচ্ছেনা দেখে জিজ্ঞেস করলো, কি'গো ঘুমাচ্ছো না কেন? রোগী উত্তর দিল ডাক্তার বলেছে সকাল সকাল ঘুমাতে, তাই সকালে ঘুমানোর জন্য বসে আছি। লকডাউনে নিম্নবিত্তদের অবস্থা হয়েছে রোগীর মত, ঘরে বসে আছে কবে সকাল হবে কেউ জানে না। এদিকে পেট তো আর খালি থাকতে চায় না! 

কাজ না পেয়ে সবাই ছুটে এক পুটলা ত্রানের খোজো ত্রান বিতরনের সম্ভাব্য লোকদের দ্বারপ্রান্তে। কেউ এককেজি চাল, কেউ আধাকেজি আলু, কেউ একপোয়া পেয়াজ দিলে তা'ই দিনে খেয়ে না খেয়ে দিন চলতে থাকে। সরকারী যে চাল ত্রান হিসেবে পাওয়া যায়, সেটা নেয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিনিধির কাছে জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নাম্বার লিখে দিতে বলা হয়েছে। অনেকের মোবাইল থাকলে তো নাম্বার দেয়া যায়। এখন কথা হচ্ছে ফটোকপি করবে দোকান ছিল বন্ধ, নাম্বার লিখে দিতে হবে, আবার কার কাছে জমা দিবে এটাও অনেকে জানে না, হয়েছে বিপদ। এর মাঝে অনেক জায়গায় অল্পদামে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দেয়া শুরু করেছে, তাও আবার একগ্রাম থেকে আরেক গ্রাম পর্যন্ত লাইন। লাইনে জায়গা রাখার জন্য অনেকে ফজরের আযান দেয়ার সাথে সাথে লাইনে গিয়ে হাজির, গাড়ি আসবে সকাল নয়টার পরে। দীর্ঘ ছয় সাত ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে তারপরে যদি কাঙ্খিত অল্প মূল্যের জিনিস পাওয়া যায়। কয়েক জায়গায় লোক কমও হয়েছে।

এভাবে করোনা আক্রান্ত মহামারীর দিনগুলিতে নিম্নবিত্ত মানুষের সংসারের মেরুদন্ড ভঙ্গুর প্রায় অবস্থা। মহামারী কেটে যাবে,  মানুষের স্বাভাবিক দিন ফিরে আসবে, সবকিছু আগের মত চলবে, কিন্তু নিম্নবিত্তের সংসার আগের মত টিকে থাকবে তো! সমাজের মানুষেরা এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকবে তো! এভাবে চলছে অনাহারী মানুষের দিন গুনার পালা, কবে থামবে কেউ জানেনা, সবাই তাকিয়ে ওই আকাশের পানে!

Newer Posts Older Posts Home