The social page

Sunday, May 10, 2020

মা দিবস ও সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা


মা দিবস ও সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা


এক অটুট অবিচ্ছেদ্দ তুলনাহীন সম্পর্কের নাম মা, একচেটিয়া ক্রেডিট ভালবাসার নাম মা, এক বুক ভাটা কষ্টের মাঝে এক প্রাচীরের নাম মা, এক স্নিগ্ধ কোমল ভালোবাসার নাম মা। মা, সে এক ঐশ্বরিক সৃষ্টির অদ্বিতীয় ভালোবাসা। আর এই মা'কে আন্তর্জাতিক ভাবে একটি দিন সম্মান প্রদর্শন করাই মাতৃ দিবস বা মাদার্স ডে। মা'কে ভালবাসার ও সম্মান করার জন্য একটি দিনে কি তার ঋন শোধ করা সম্ভব! মায়ের কোমল ভালোবাসার সম্মান কি এক দিনে দেয়া সম্ভব। ভালবাসা রইলো সেই সকল মায়েদের, যারা বৃদ্ধাশ্রমে বসে ছেলের মঙ্গল কামনা করছে। শ্রদ্ধা জানাই যারা ছেলেমেয়ে থাকতেও এখনও নিজেরা কাজ করে চলছেন।

মা শব্দটি সকল দেশে, সকল ধর্মে, সকল সভ্যতায় নিরন্তর শ্রদ্ধার জায়গা। প্রাচীন গ্রীসে সর্বপ্রথম মা কে সম্মান জানানোর জন্য বাবা দিবসের ন্যায় মায়ের প্রতি ভালােবাসার মাদারিং সানডে চালু করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময় মাদারিং সানডে চালু হয়েছে। প্রায় বেশিরভাগ দেশে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত দিনে পালন করা হয়ে থাকে। চীন সহ অন্যান্য দেশে এ দিবসটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া সকল ধর্মেও মায়েদের জায়গা শ্রদ্ধার অতলস্পর্শে। ক্যাথলিক ধর্মে মেরিকে, হিন্দু ধর্মে মাতা তীর্থ অতসী ও মুসলমান ধর্মে হযরত মোহাম্মদ (স:) এর কন্যা হযরত ফাতিমাকে মা হিসেবে স্বরন করা হয়।

মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আরেক বহি:প্রকাশ দেখা যায় মেক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটিতে। এটা সারা বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত বই। ভালবাসা ও সমাজবাস্তবতার গভীর মেলবন্ধন লক্ষ করা যায় এতে। এক মায়ের এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তা 'মা' উপন্যাস না পড়লে উপলব্ধি করা দুষ্কর। এ উপন্যাসটি এতো জনপ্রিয় হয়েছে যে পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হয়েছে। আমাদের দেশেও এই বইটি খুবই জনপ্রিয় একটি বই।


মা তার সন্তানকে এবং সন্তান তার মা'কে কতটুকু ভালোবাসে তা তারা নিজেদের উপলব্ধিতেই বোঝেন। মায়ের প্রতি ভালোবাসার বহি:প্রকাশ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এমন অনেক আছে যারা মা'কে অনেক ভালোবাসে কিন্তু কখনও বলাই হয় না, মা তোমাকে অনেক ভালোবাসী, আবার কেউ মুখে বলতেছে মা তোমাকে একমাত্র আমিই ভালোবাসী! অন্যদিকে তার চিন্তা কাজ করে- তোমার নামে যে সম্পত্তি আছে তা আমায় লিখে দিও। মা এবং সন্তানের মধ্যে কেউ আবার সার্থও খুজে বেড়ান। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিস্তারের ফলে কুলাঙ্গার সন্তানের দেখা মেলে। যারা মা সহ দুই ভায়ের পরিবার নিয়ে গাজীপুর শালনায় থাকতেন। তারা মায়ের জ্বর সর্দি, কাশি করোনার কিছু লক্ষন দেখা যাওয়ায় তারা বৃদ্ধ মা কে দুই ভাই টাঙ্গাইলের সখিপুর জঙ্গলে ফেলে চলে যায়। মায়ের বাড়ি ছিল শেরপুর নালিতাবাড়ী। পরে এলাকাবাসী খবর পেয়ে বৃদ্ধ মা কে চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠান, পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় তার করোনা পজেটিভ ছিল না।

মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে মায়েরা কি পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে তা শুধু তারাই জানেন। সন্তান বাইরে গেলে দোয়া করতে থাকে, আমার যাই কিছু হোক আমার সন্তানের যেন কিছু না হয়! বাবা বাসায় বন্দি, আয় রোজগার বন্ধ কিভাবে সংসার চলবে? এর মধ্যে মায়েরা দিব্যি এক ব্যবস্থা করে ফেলে। নিজের রক্ত বিক্রি করে হলেও সন্তানের যেন কোন অভাব বোধ করে সেদিকে তার পূর্ণ চেষ্টা থাকে। সন্তানরা মা বাবা কে ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য দিবস চালু আছে কিন্তু সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের কোন দিবস লাগে না, প্রতিদিন ভোর বেলা থেকে শুরু করে অবিরাম ভালোবাসা চলতেই থাকে। এখন লক্ষ্য করা যায় যে মায়েরা সন্তানদের এতো ভালোবাসে যে, কিছু মা স্কুলে দ্বিতীয় বারের মত ভর্তি হয়, মানে সন্তানদের চোখের আড়াল'ই হতে দেয় না, স্কুলে ভর্তির দিন থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন পর্যন্ত স্কুলে আনা গোনা চলেই। সন্তানের স্কুল দশটায়,  তাকে উঠতে হয় ছয়টায়, নাস্তা তৈরি করো, প্রাইভেটে নিয়ে যাও সাড়ে আটটায়, সেখান থেকে স্কুলে টিফিন সহ দিয়ে আবার চারটায় নিয়ে যেতে হবে কোচিং এ, এরপর বাসায় প্রাইভেটের জন্য তৈরি করা, শুক্র, শনি গানের ক্লাস, নিজের কোন সময় নেই। কিছু মা অন্যরকম হয়ে থাকে, তাদের সন্তানদের যন্ত্রে পরিণত করে, সেই সন্তানের মধ্যে সামাজিকতা, মানসিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ কিছুই খুজে পাওয়া যায় না, এরা পল্ট্রি মুরগীর মত নাক ডুবিয়ে পড়াশোনা আর পড়াশোনা করাতে পছন্দ করে। এই জায়গায় ভালোবাসাটা একটু বেশি পরিলক্ষিত হয়।

মায়েরা যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তোলে, তেমনি একজন সন্তানেরও উচিত তার জন্মদাতা মা'কে উপযুক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা করা। তাদেরকে তাদের অপূরনীয় কষ্টের মূল্য দেয়া এবং শেষ বয়সে সুখের ঠিকানা তৈরী করে দেয়া প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু বাস্তবে তার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় অনেক জায়গায়। সন্তান সাবলম্বী হবার পর দেখা যায় মায়ের সাথে সম্পর্কের বিচ্যুতি ঘটে, মায়ের শেষ কাল হয়ে ওঠে দুঃখ সারসম্পুর্ন। যার ফলে দেশে বৃদ্ধাশ্রমে সদস্য বেড়েই চলেছে। ২০২০ এর আইনে অবশ্য একটি আইন পাশ করা হয়েছে, তা হচ্ছে কোন সন্তান যদি তার মা বাবার দ্বায়ভার না নেয়, তবে সেই সন্তানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

যত দুঃখ, জরাজীর্ন কাটিয়ে মা এবং সন্তানের অটুট বন্ধন গড়ে উঠুক, সকল মায়ের ঘর খুশিতে ভরে উঠুক, সফল হোক মাতৃ দিবস, সকল মায়ের জয় হোক।

No comments: