The social page

Tuesday, May 12, 2020

মহামারী করোনায় বিদায় গৃহকর্মী, ঘরোয়া করলো অনেক দুলালীকে


মহামারী করোনায় বিদায় গৃহকর্মী, ঘরোয়া করলো অনেক দুলালীকে


আড়ম্বরপূর্ণ নিত্য দিনে বিলাসবহুল জীবন চলছিল একশ্রেণীর দুলাল-দুলালীদের। যারা খাবারটা নিজের হাত দিয়ে তুলে খাওয়া ছাড়া ঘরের অন্য সব কাজ বাড়ীর গৃহকর্মীরাই করে দিত। কাপড় কাচা, ঘর মুছা, রান্না করা, টয়লেট পরিষ্কার করা, খাবার দেয়া, থালা বাসন পরিষ্কার করা, বাচ্চা পালন, ঘর গুছানো, বাজার করা, ময়লা ফেলা ইত্যাদি ঘরের যাবতীয় কাজ প্রতিদিন করতে হয়। নিজেদেরকে দেখাশোনা করার জন্য ঘরে বাইরে কেয়ার টেকার সর্বদা কাজের জন্য অপেক্ষা করতো। ভাগ্যিস বিছানার কাজটা কাউকে করে দিতে বলে না। এখন মানুষ এতটাই উন্নত জীবন যাপন করে যে, অনেকে টয়লেট করার পর নিজের হাত দিয়ে পানি ব্যবহার করে না, অত্যাধুনিক কমোডই সেই কাজটা করে দেয়। নিজেদের শুধু কষ্ট করে ছাড়তে হয়। প্রতিদিন ফ্লোর, টয়লেট, রান্নাঘর পরিষ্কার আবশ্যকীয় কর্ম ছিল। নিজেদের মনে হয় গরম পানিটা পর্যন্ত রান্না করে খেতে হয়নি। সকল রান্না করার জন্য গৃহকর্মীরা তো ছিলই। এরই মধ্যে চলে আসলো শতবছরের আরাম ভঙ্গকারী ছোয়াচে মহামারী করোনা। যেখানে নিজের হাতেরই বিশ্বাস নেই, অন্যের হাতকে কি বিশ্বাস করবে। আতঙ্ক শুরু হলো বাড়ির মালিক আর গৃহকর্মীদের মাঝে। সবারই তো জীবনের মায়া আছে! একদিকে বাড়ির বিভিন্ন কাজে বাড়ীর বাইরে যেতে হয় গৃহকর্মীদের, অপর দিকে বাড়ীর মালিকদেরও অনেক কাজে বাইরে মানুষের সাথে মিশতে হয়, কে জানে কার শরীরে ভাইরাস বহন করে ঘরে নিয়ে আসে। পরে হবে এক জগাঘন্টা। সেই জন্য পরিস্থিতি বিপদজনক হওয়ার আগেই প্রায় অনেক গৃহকর্মীকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়, সেই সাথে এক মহা বিড়ম্বনায় পরতে হয় অনেক দুলাল-দুলালীদের।

যেখানে প্রতিবেলায় রান্না হতো পাঁচ ছয় প্রকারের খাবার, এখন ডিম ভাজি আর আলু সিদ্ধ খেয়েই বেচে থাকতে হচ্ছে। দিন দিন করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে, রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে, মানুষের মধ্যে ভয়ও কাজ করছে। বিপদ হয়েছে দুলালীদের, যারা আলতা মাখা পায় বসে বসে ফ্যাশনশো করতো, পায়ের উপর পা তুলে শুধু অর্ডার করতো। বাবা মার বাড়ীতে তো জীবনে রান্না-বান্না শিখেই নি, জামাইয়ের ঘরেও তেমন রান্না করতে হয় না। লকডাউনের ফলে একটা আছোলা বাঁশ খেয়ে গেল দুলালীরা, ঘরে স্বামী সন্তানসহ বন্দি একটা অবস্থা, এখনতো বাজতে হবে! ভাগ্য ভালো ইউটিউব বাবাজি আছে! যেখানে সন্তান জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে কবরে শোয়ানি পর্যন্ত সকল কাজের টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। এখন ইউটিউব থেকে দেখে দেখে ডিম ভাজি শিখতে হয়, তাও লবন একটু কম বেশি হয়ে যায়। ভাত রান্নার জন্য কতটুকু পানি দিতে হয়, আলু সিদ্ধয় কতটুকু পানি দিতে হয়, আরো কত টেনশন। খাবার পর তো কোন সময় থালা ধুয়ে অভ্যাস নেই, এ কাজটা এসে পরেছে দুলাল সাহেবদের উপরে। কি আর করার বউ যখন জলে নেমেছে স্বামীকে তো নামতে হবেই।

এমন কোন দিন নেই, যেদিন ফ্লোর মুছা, টয়লেট পরিষ্কার করা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা নিয়ে রহিমার মা'কে কথা শুনতে হয়নি! আব্দুলের বাপও ছার পায় নি বাজার করা নিয়ে কথা শুনতে। এখন এসব কাজ নিজেদেরই করতে হয়। দুলালী বউ একদিন ফ্লোর মুছতে যেয়ে পরেরদিন থেকে সর্দি বাধিয়ে বসে আছে, রান্না করতে যেয়ে ঘেমে সর্দি আরো বেড়ে যায়, শুরু হয় গলাব্যথা, মাথাব্যথা আরো কত ঢঙ। এবার ঘরের সকল দায়িত্ব এসে পড়লো দুলাল বাবাজিদের কাধে, চৌধুরি সাহেবের ছেলে করবে রান্না-বান্না, ইউটিউব দেখে কোন মত ঘেটে ঘুটে কিছু আলুর দম রান্না করে খাচ্ছে পরিবার মিলে। এখন রান্না-বান্না তো কোন মতে চলছে,  এগুলো পরিষ্কার করে কে? দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে রান্না ঘরে, টয়লেট, ডাইনিং রুমে। দু'দিন না যেতেই দুলাল সাহেবেরও পানি নেরে জ্বর সর্দি বেধে যায়। আর যাবে কোথায! দুজনের মনেই কতো সন্দেহ, তাদেরই করোনা হলো কি'না, কত দুঃচিন্তা!

এই মহামারী করোনায় প্রায়ই দেখা যায় কিছু মহিলা জীবনে রান্না করেনি, যা'ই রান্না করুক না কেন, সেটাই ফেসবুকে আপলোড। নতুন নতুন রেসিপি শিখছে, রেসিপি করতে যেয়ে সারাদিন পার, এদিকে উপোস থাকতে হয় দুজনকেই। সাধের রেসিপি করার পরেই আগে সেলফি তুলে আপলোড, স্টেটাস দিচ্ছে প্রিয়তমর জন্য রান্না করেছে, পরে খাবার সময় দেখা যায়, কালারটা সুন্দর হয়েছে কিন্তু লবনটা'ই দিতে ভুলে গেছে। গেল, সারাটা দিন মাটি গেল! মুখগুলো তখন খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

কাজের লোককে করোনা জনিত কারনে ছুটি দেওয়ায় নিজেদেরই রাজারে যেয়ে বাজার করতে হয়, আগে তো গফুর চাচা বাজার করলে কত কিছুর ভুল ধরা হতো, এখন নিজেরা যেয়ে পচা-গন্ধ যা পায় তা'ই নিয়ে আসতে হয়। বাসায় যেভাবে চিন্তা করা যায়,৷ বাজারে এরকম ফল পাওয়া যায়না! আকাশের মালিকের কি বিচার! চারদিকে যখন অত্যাচার, ব্যাভিচার বেরেই চলেছে তখন নিজ হাতে তার সমতা আনার জন্য কি মহামারী করোনা পাঠালেন। পেপার পত্রিকা খুললেই দেখা যেত গৃহকর্মীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষন, হাত পুড়িয়ে দেয়া, গায়ে ছেকা দেয়া আরো কত কি! এই মহামারীতে সেই সকল মালিককে চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে গৃহকর্মীদের কষ্ট অনুভব করার, তাদের প্রতি সহমর্মিতা করার, সবার মধ্যে মানসিকতা বোধ তৈরি করার। সবাইকে এক কাতারে আসার মহান শিক্ষা এই ভয়াবহ করোনার মহামারীতে জানান দিয়ে যাচ্ছে, ধ্বনিত হচ্ছে সকল মানুষ এক হও, মানুষের কল্যানে এগিয়ে যাও।

No comments: