The social page

Wednesday, May 13, 2020

রাতের পরীদের জীবন সঙ্কটে মহামারী করোনার প্রভাব


রাতের পরীদের জীবন সঙ্কটে মহামারী করোনার প্রভাব


নীলিমার দ্বিপ্রহরের আলো ছড়িয়ে ছোছনাকে আড়াল করে দিয়ে একপশরা আমাবশ্যার ছায়া নিয়ে বিনিদ্র রজনী কোন অজানা প্রান পুরুষের হৃদয় আন্দোলিত করে নিজেদের জীবনচক্র অতিবাহিত করে, মেঘমল্লার ঝঞ্জার নিয়ে, আলোর প্রখরতা কাটিয়ে, আগুনের ফুলকির রুপে উদীয়মান জীবন কর্মীরাই রাতের পরী। নিজেদের পণ্য বানিয়ে ভোক্তাদের কাছে নিজেদের স্বপে দিয়ে উপার্জন করতে হয় এই পরীদের। অজানা পুরুষের একনিমেষের সুখের কারীগর এই রাতের পরীরা। এদের কে শুদ্ধ বাংলায় পতিতা বলেই আখ্যায়িত করা হয়। এদের জীবন অত্যন্ত কঠিন এবং মানবেতর। কারো কারো জীবন চিত্র এতটাই কষ্টদায়ক যে, কোন জল্লাদ শ্রবন করার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারবে না। আমাদের দেশে বৃটিশ শাসনামলের সময় থেকে পতিতা বৃত্তি চালু রয়েছে। আমাদেে দেশে প্রায় চৌদ্দটির মত পতিতালয় আছে। এগুলো বড় বড় জেলা শহরে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিমালিকানা ছোট পরিসরে পতিতাবৃত্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় চাপে অনেকবার বিভিন্ন পতিতালয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরে আবার সরকারী সহযোগীতায় এগুলো আবার চালু করে দেয়া হয়। এগুলো পতিতালয়গুলো জনসাধারনের আনাগোনা আছে এমন জায়গায গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো বানিজ্যিক এলাকাগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। বিভিন্ন ঘাট, স্থল বন্দর, নৌ বন্দর, রেল স্টেশনের পাশে গড়ে উঠেছে।

মহামারী করোনা আমাবস্যার মত দেশে ছড়িয়ে পড়লো, আস্তে আস্তে দেশের অনেক বানিজ্য বন্ধ হতে লাগলো, লোক সমাগম বন্ধ করে দেয়া হলো, মানুষকে ঘরবন্দি থাকতে বলা হলো, নিরাপদ দুরুত্বে থাকতে বলা হলো, মেলামেশা থেকে বিরতি থাকতে বলা হলো, আস্তে আস্তে অন্ধকার নামতে লাগলো রাতের পরীদের উপর। এরা দেহ বিক্রি করা উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবনযাপন করে। জীবনের সাড়ে তের ঘাট পাড়ি দিয়ে এ পেশায় কাজ করতে হয়। প্রতিটা সময় বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা আর অনিশ্চয়তার উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়। তাদের জীবনটা পদ্ম পাতার পানির মত, চিরায়ত সবুজের মাঝে এক কণা শিশির বিন্দুর মত। যতদিন যৌবন আছে ততদিন কামিয়ে দেয় মহাজনদের, পরে পরিনত হয় অনিশ্চিত জীবনে।

রাতের নির্মল পরীদের কোন সামাজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। তাদের মত করে নিজেদের তৈরি সমাজবদ্ধ জীবন পার করে। পতিতালয় বা দেহ ব্যবসায় কাজ করে এরা জীবনের সঙ্কটাপন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে এই জায়গায় এসে দ্বারায়। নিজেদের আসল পরিচয় কখনও এরা প্রকাশ করে না। একটা পর্যায় জীবন বাস্তবতার প্রতি এমন ঘৃণা জন্মায় যে পরে সমাজে ফিরে আসতে চায় না, সেখানেই নিজেকে বিকিয়ে দেওয়ার কাজটা মেনে নেয়। সর্বত্র দুনিয়া জুড়ে মহামারীর মধ্যে কিভাবে চলবে এই সম্প্রদায় টিকে থাকবে তা চিন্তা করা উচিত। সর্দানিদের অন্তর্ভুক্ত শত শত যৌন কর্মীর কপালে প্রতিদিন দেহ বিক্রি করতে পারলে ভালো কিছু জোটে আর খোদ্দের না ধরতে পারলে কপালে নেমে আসে অসার দুঃখ মাখা মুহূর্ত। খুবই চেলেঞ্জিং একটা জীবন, এখানে এরা প্রতি মুহূর্তে, প্রতি দিনে সংগ্রামের সাথে টিকে থাকে। করোনা ফলে ব্যবসা বানিজ্য বন্ধ দু'মাস ছাড়িয়েছে। দু'মাস তিন বেলা খাবার চারটি খানি কথা না। কর্মীদের সর্দানীরা কতদিন বসিয়ে বসিয়ে পালবে! এদের জীবন যাত্রা এখন হুমকির মুখে সম্মুখীন। যাদের ঘরে দু'একটা তাগড়া টসটসে কর্মী আছে তারা ভদ্র সমাজে হোম ডেলিভারী সার্ভিস দিয়ে কোন মত টিকে আছে। যেহেতু করোনা রোগটি একেবারেই ছোয়াচে তাই খদ্দেরও এদের দিকে ভিরছে না।

যৌন পল্লীগুলোতে প্রায় অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এরা কোথায় কার কাছে গিয়ে দাড়াবে। সাধারন মানুষতো ক্ষুদার জালা সহ্য করতে না পেরে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দাড়াচ্ছে, কিন্তু যৌনকর্মীরা কার কাছে গিয়ে দাড়াবে, কাকে বলবে আমি ক্ষুদার্থ আমায় খেতে দাও, কাকে বলবে আমার সন্তান দুইদিন ধরে না খেয়ে আছে একটু ওর মুখে খাবার তুলে দিন, কাকে বলবে আমার জড়ায়ু আর পাকস্থলির জন্য ওষুধ খেতে হয় আমায় কিছু টাকা দাও আমি ওষুধ খাব। এরা চাইলেও কথাগুলো সমাজের লোকদের বলতে পারে না, বললেও সমাজের লোকেরা এদের মেনে নিতে পারে না। কারো কাছে কিছু চাইতে গেলে শুনতে তোরা তো বেশ্যা, তোদের দিয়ে কি হবে! তোদের তো সমাজও পছন্দ করে না আল্লাহ ও পছন্দ করে না, গরীব মানুষরে দিলে দোয়া করবো, সেই দোয়া কাজে লাগবো। অথচ এই সমাজের মানুষগুলোই কিন্তু এদেরকে যুগের পর যুগ পতিতা বানিয়ে আসছে, এদেরকে নিবন্ধন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে পতিতা হিসেবে। আজকে যে বেশ্যা বলে পতিতাদের দূরে সরিয়ে রাখছে, তাদের মধ্যেই কিন্তু অনেকে এদের দোয়ারে যেয়ে ধন্যা দিত, একটু সুখ দে! বাড়ির বউয়ের কাছে সুখ পাই না! একটু আদর দিয়ে আমার সব জ্বালা ভুলিয়ে দে, এসব কথা বলে বিছানায় ঝাপিয়ে পরতো, সেই কাঙ্খিত সুখ নিয়ে দু'শ পাঁচশ ধরিয়ে দিয়ে চলে আসতো। অনেক আবার দেখা যেত বউয়ের জন্য কোন দিন শাড়ি কাপড় কিনে আনে না, কিন্তু রাতের পরীগুলোর জন্য কাপড়, চূড়ী, কসমেটিকস নিয়ে সুখের কাঙাল হয়ে পাড়িজমায়।

আজকের এই দুর্দিনে কেউ যদি তাদের কে সাহায্যও করতে যায়, সমাজ থেকে নির্দিধায় বলে যায়- এই লোক বেশ্যাদের সাহায্য করে, এই লোক খারাপ। যৌন পল্লীগুলোতে চড়া দামের চাঁদা, সুদ, ঘোষ লেগেই থাকে। সব সময় একটা অরাজকতা বিরাজ করে, সুদখোর মহাজনরা চড়া সুদের জন্য মাথার উপরে দাড়িয়ে থাকে, তাহলে যারা পাওনাদার সুদখোর আছে তারা কি বসে থাকবে টাকা উদ্ধার করতে? তাদের চাপ তারা দিয়েই যাবে, না খেয়ে আছে কি'না তা দেখার সময় নেই। সমাজের কত ভদ্র লোকের আনাগোনা চলতো পল্লীর ভিতরে, কিছু মুহূর্তের সুখের জন্য এদের কাছে ছুটে অনেক। সমাজ থেকে অরাজকতা কমাতে পল্লীগুলো টিকিয়ে রাখতে হয সমাজের মানুষের জন্য। যেভাবে দেশে ধর্ষন, মাদক অবাধে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে, তা বেড়ে গেলে আর লাগাম টেনে ধরা যাবে না। সমাজকে টিকিযে রাখার জন্য টিকিয়ে রাখা হয় রাতের পরীদের যৌন পল্লী গুলো, সমাজের মানুষগুলোর জন্য গড়ে তোলা হয় পল্লীগুলো, এখনতো পল্লী টিকিয়ে রাখতে হলে পল্লীর মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে, রাতের পরীদের বাচিয়ে রাখতে হবে, এদের সহযোগীতা করতে সমাজের মানুষেরই এগিয়ে আসা উচিত, তারাও তো মানুষ, তারাও তো আমাদের বোন, তাদেরও তো আমাদের মত সন্তান আছে, তাদেরও অধিকার আছে দেশের নাগরিক হিসেবে, তারাও তো তাদের দেহ বিক্রি করা টাকা দিয়ে ট্যাক্স পরিশোধ করে। কেউ হয়তো জানে না মহামারী করোনার ভয়াবহতা কতদূর যাবে, তাই মানুষ হিসেবে মানুষ গুলোকেই এগিয়ে আসা উচিত। রাতের পরীরা তাকিয়ে আকাশের পানে, কবে সুদিন আসবে, কবে খদ্দেরে ভরে উঠবে তার ঘর, কবে সুদের টাকাটা পরিশোধ করবে, আবার বাচ্চাদের মুখে দু'বেলা ভাত তুলে দিতে পারবে, আকাশের মালিক কবে তাদের দিকে ফিরে তাকাবে!

No comments: