The social page

Friday, May 15, 2020

চারদিকে মহামারী; অনিশ্চিত সঙ্কটের দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন

চারদিকে মহমারী; অনিশ্চিত সঙ্কটের দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন



বেলা বয় অরিন্দম জীবনের অগনিত সময়ের প্রতিকুল মুহূর্তের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে। দিগন্তে রবি উঠে দিগন্তে হারায়, এরই মাঝে ভেসে আসে আহাজারী আর মানুষের কান্না। বাড়ছে লাশের মিছিল, থামছেনা আক্রান্তের সংখ্যা, পলকে বেড়েই চলেছে রোগী। অস্পষ্ট ভবিষ্যতের আগাম বার্তা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, থমকে দিচ্ছে জনমানুষের জীবনের গতি, আটকে আছে শিল্প নগরীর চাকা, নির্বাক কোটি কোটি মানুষের চোখ। এর মাঝেও কিছু মানুষের আনন্দের স্ফুলিঙ্ক বেয়ে চলেছে, আগাম উৎসবের আনন্দকে কিছুতেই হারাবে না। অন্যদিকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন চলছে আতঙ্কে, সঙ্কায়, অনিশ্চয়তায়। অবারিত কান্নার সুর মোহময় হয় মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের গোড়দোড়ায়। উচ্চবিত্ত গুনছে হিসেবের খতিয়ান, কোন দিকে পুষিয়ে তুলতে পাড়ছে না সময়ের শূন্যতায়। নিবীড় পর্যবেক্ষনের আশায় পিদিম জলছে না চিন্তশীল মানুষের। হিসেব কষে মাথায় বাজ পড়ছে ব্যবসায়িদের, কি চলছে এসব! টিকে থাকবো তো! আবার কি মা'কে খুশি করার জন্য একখানা শাড়ী আর বউকে খুশি করার জন্য হাউসের গয়না কিনে দিতে পারবে! শেষ পরিণতি কি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে কি'না সে নিয়ে সন্ধিহান। শিক্ষার আলো থেকে আড়াল পড়েছে ছাত্রজীবন, অনিশ্চতায় বাস্তব পরিস্থিতি। আবার কি একই ক্লাসে সবাই কি ফিরতে পারবে, না'কি কেউ ছিটকে পড়বে! সব শিক্ষক কি হাজিরা দিবেন ক্লাসে না'কি কেউ কেউ মহামারী করোনায় হারিয়ে যাবেন, তা অনিশ্চয়তায় পর্যবেশিত হয়েছে।


করোনা মহামারীর বিস্তার রোধের জন্য মার্চ মাসের প্রথম দিক থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছিল। এর আগ মুহূর্তে চলছিল এসএসসি পরীক্ষা, স্কুল গুলো পরীক্ষার জন্যও বন্ধ ছিল। এইচএসসি পরীক্ষাটা অনিশ্চিত গন্তব্যে পৌছেছে। সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হলে ছাত্ররাও ঘরমুখো হয়, আটকে পরে চারদেয়ালের মাঝে। প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখলে ছাত্র ছাত্রীরা পড়াশোনার স্পর্শে থাকে, আর প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাইরে চলে যায়। একটা অংশ অবশ্য ভালো রেজাল্টের তাগিদে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। লগডাউনের তৃতীয় মাসে পদার্পনে ছাত্র-ছাত্রীদের খবর নিলে জানা যায়, বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীরা ভার্চ্যুয়াল জগতের সাথে সময় পার করছে। অভিভাবকদের চাপ থাকলেও নিজেদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে।


লকডাউনকালীন ছাত্রদের সিডিউল লক্ষ্য করতে গেলে দেখা যায়, ঘুম থেকে উঠছে ১১/১২ টায, কেউ হয়তো রোজা রাখছে কেউ নয়, উঠার পর ইন্টারনেট ব্রাউজিং শুরু, বিভিন্ন সাইট ব্রাউজিং এর পর খাবার গোসলে সন্ধ্যা প্রায়, সন্ধায় যারা রোজা রাখে ইফতার করে, সন্ধার পর অভিভাবকের চাপে হয়তো ঘন্টাখানেক বসা হয়, তারপর খোজ চলে এলাকার আড্ডায়। লকডাউনের কারনে অবশ্য বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেযাও নিরাপদ নয়, তাই কাছাকাছি আড্ডার পর বাসায ফেরার পর আবার ইন্টার্নেটে ব্রাউজিং চলে, রাতে কিছু খেয়ে না খেয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে ব্রাউজিং, এভাবে একই সময়ের পুনরাবৃত্তি চলে অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের। আর ছাত্রীদের বেলায় এখন লক্ষ্য করা যায়, বিভিন্ন সিরিয়াল আর ওয়েব সিরিজের মুখস্তের পালা চলে (ওয়েব সিরিজ অবশ্য সর্বত্র ছড়ায়নি)। ছেলেরা একটু হলে বের হতে পারলেও মেয়েরা মেয়েরা একেবারে ঘরবন্দী।


সারা বিশ্ব ঘরের ভিতর ঢুকে যাওয়ায় বিশ্বকে দেখা যায় স্যাটেলাইটে। ছোট বড় সবার চোখ এখন টেলিভিশন পর্দার উপর। শিক্ষা, বিনোদন, খবর দেখেই অতিবাহিত হয় সিংহভাগের সময়। পরিবারের সবাই ঘরের ভিতর অবস্থান করায় প্রায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে, আমরাই মনে হয় বেশি খারাপ আছি! আমার ছেলে মেয়েটাই মনে হয় পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে গেছে, সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট মনে হয় আমার ছেলেটারই হবে, এসব বিভিন্ন চিন্তায় সময় পার করছেন অভিভাবকরা। আবার যারা পড়াশোনা পরবর্তী সময়ের চাকরীর প্রস্তুতির পড়াশোনা করে, তাদের জন্য একটু ভালো হয়েছে, সারাদিন ঘরে থাকছে এবং পড়াশোনার সাথেই থাকছে।


কিছু ছাত্র-ছাত্রী অনেক কাছ থেকে পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতির রূপ দেখতে পারছে। বাবা মায়ের সঙ্কটের জায়গা উপলব্ধি করছে। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে ভেঙ্গে পরেছে, নিজেদের বাবাকে দেখছে ত্রানের জন্য দৌড়াচ্ছে, বাড়িতে সরকারী মোটা চাউলের ভাত রান্না হচ্ছে, বাবাকে অল্পমূল্যের জিনিসের লম্বালাইনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অনেকে হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়ছে। মস্তিস্কে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, দেশের বেকার সংখ্যা ও পারিবারিক সঙ্কট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর পারিবারিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠে আবার ক্লাসে মনোযােগী হওয়া এখন ভাবনার বিষয়। অনেকের হয়তো পারিবারিক টানাপোড়ানে নিজেদের ছাত্র অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না।


মহামারী করোনার ফলে ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের চাহিদা ব্যাপক ভাবে বেড়ে চলেছে। ঘরে বসে অনেকে ইউটিউবিং, ফ্রিলান্সিং করে সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছে। অনেকে অনলাইন কোর্সে মনোনিবেশ করেছেন। লকডাউনে স্যাটেলাইট ব্যবসায় নতুন গতি যোগ করেছে। ঘরবন্দি ছেলেমেয়েদের একমাত্র সময়ের সাথী এই স্যাটেলাইট।


সময় গড়াচ্ছে আর করোনার ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামনে ঈদ উপলক্ষে অনেক কিছু স্বাভাবিক করে দেয়ার কথা চলছিল, কিন্তু রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে সবার মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে চলেছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। অনুমান করা যায় না কবে প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের নিজস্ব কার্যক্রম শুরু করতে পারবে, এমতাবস্তায় ছাত্রদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কালের দিকে অতিবাহিত হচ্ছে। ছাত্রদের এবছরের কার্যক্রম বেশিরভাগ সময়ই বিফলে পতিত হচ্ছে। বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো পার হয়ে যাচ্ছে ছাত্রদের জন্য, এই ক্ষতি পূরনে পরবর্তীতে কতটুকু কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে তা পরিস্থিতি বলে দিবে। এসময় আরো কিছু দিন চলতে ধাকলে হয়তো অনেকে ভুলেই যাবে তাদের স্বীয় পরিচয়ের কথা। এই কঠোর পরিস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কতোটা স্বাভাবিক রাখা যায় তা সময়ের দাবি! 

No comments: