The social page

Sunday, May 31, 2020

সেচ্ছায় মৃত্যু যাপনের দিকে বাংলাদেশ এবং ভবিষ্যৎ

সেচ্ছায় মৃত্যৃ যাপনের দিকে বাংলাদেশ এবং ভবিষ্যৎ


লকডাউনের প্রায় ৭০ তম দিন থেকে সব কিছু মোটামুটি খুলে দেয়া হচ্ছে। স্কুল, কলেজ আপাতত কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে না। অর্থনীতির বেহাল দশা ঠেকাতে, মানুষকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার তাগিদে, সামাজিক নিয়ম মেনে চলার নীতিতে শিথিল করা হচ্ছে লকডাউন। ঈদ পরবর্তী সময়ে করোনা সনাক্তের সংখ্যা দাড়ায় প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি। মৃতের সংখ্যা প্রায় ছয়শ এর বেশি। মানুষ ভয়কে জয় করার প্রত্যয়ে নিজেদের কর্মস্থলে ফেরত আসতে চায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষ জানে করোনা রোগীর পরিণতি কি হয়, কত কষ্ট হয়, কত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। যারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে না, তারা মৃত্যু বরন করে। করোনা পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের গলায় টান পড়েছে, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অন্তকালের সম্মুখিন। এক খবরে শোনা যায়, চিনে নাকি এখনও এ রোগ পুরোপুরি সেরে উঠেনি, এর প্রতিষেধকও তেমন ভাবে বের হয়নি, তারা নাকি গরমপানির উপর দিয়ে করোনাকে জয় করে নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশ তাদের মত করে এর প্রতিষেধক বের করছে এবং এর ব্যবহার করছে। শতভাগ কার্যকর না হলেও সিংহভাগ সফলতার মুখ দেখছে সকল দেশ। মৃত্যু হার তুলনামুলক অনেক কমেছে। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু মানুষের মৃত্যু ভয় দিন দিন কমছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে এখন মৃত্যুকে পুজি করেই পথ চলতে হবে। মানুষ নিয়তিকে মেনে নিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছে। মরন ঘন্টা সবারই একসময় বাজবে, মরার আগেই যদি মরে যাই তবে দ্বায় বদ্ধতা পিছন ছাড়বে না।

এখনও আপাতত গ্রামে করোনা ভাইরাস তেমন বিস্তার লাভ করতে পারে নি। এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট আক্রান্ত ৪৫ হাজারের মত, বেশির ভাগই বড় বড় শহর অঞ্চল গুলোতে। ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চট্রগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, জামালপুর সহ শহর অঞ্চল গুলোতে করোনা রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে। গ্রাম গুলোতে গেলে লগডাউনের মধ্যে দেখা গেছে বাজার গুলো আগের মত সব কিছুই খোলা, মানুষের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করে না। তাদের মধ্যে একধরনের ধারনা, করোনা রোগ নিয়ে কেউ মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছে, আসলে করোনা বলে কিছু নেই। কত রোগ হইলো কিছু হইলো না, আর করোনা আর কি করবো। তাদের ধারনা আল্লাহ বড়লোক দেশগুলারে গজব দিসে, আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু আমাদের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কে জানে আমেরিকার বিষেশজ্ঞদের ধারনা কি সত্যি হয়ে যায় কি'না। তাদের ধারনা আমাদের দেশে এক-তৃতীয়াংশ লোক করোনায় আক্রান্ত হবে। যদি এটাই সতি্য হয় তবে বাংলাদেশ নামের এক ভুখন্ড পৃথিবীর মানচিত্রে ঝুলে থাকবে। আঠারো কোটির বাংলাদেশে সত্তর দিন লকডাউনের ফলে অর্থনীতির যে বেহাল দশা হয়েছে, আরো কিছুদিন থাকলে মানুষ খুদার জ্বালায় রাস্তায় নেমে আসতো। সরকারী ভাবেও বেশ সহযোগীতা চালিয়েছে সারাদেশে, কিন্তু সরকারেরও তো একটা লিমিটেশন আছে! আমাদের দেশ তো আর কানাডার মত উন্নত দেশ নয় যে মাসের পর মাস আমাদের ঘরে বসিয়ে মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করবে।

জুন মাস পরে গেল, লকডাউন পনের দিনের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সব কিছু করতে বলা হয়েছে, নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জুনের পনের তারিখ পর্যন্ত। পনের দিনের ফলাফল দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মানুষ তাদের কর্মে ফেরার জন্য এতটাই মুখিয়ে আছে যে, ঘোষনা শুনতে দেরি হয়েছে কিন্তু সবকিছু খোলার প্রস্তুতি নিতে দেরি হয় নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো সল্প পরিসরে খোলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, হাট বাজার বিকাল চারটা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা বলেছেন। বগুড়ায় ঈদের আগে ১/২ দিন শপিং করার জন্য মার্কেট সল্প পরিসরে খোলা ছিল, ফলশ্রুতিতে একসাথে পঞ্চাশ জনের করোনা পজেটিভ আসে দুদিন পরেই। রোজার মধ্যে গিয়েছিলাম জরুরি কাজে ঈশ্বরগঞ্জ, সেখানের বাস্তব চিত্র দেখে আমার মনে হয়েছে এদেশ থেকে লজ্জায় করোনা পালিয়ে যাবে, যে দেশে মানুষ এ রোগটিকে দামই দিচ্ছে না, অথচ এ রোগ পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে কাদিয়ে ছেড়েছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নাকানি-চুবানি দিয়ে ছেড়েছে। আর আমাদের দেশে লবন পান্তার মত ব্যাপার হয়ে দারিয়েছে। যেটা চোখে পরার মত ছিল, হাট-বাজারের সকল দোকান পাঠ খোলা, কারো মুখে মাস্কের বালাই নে, সামাজিক দুরত্ব তো চিন্তাই করা যায়, আর চায়ের দোকানের আড্ডা যেন আগের চেয়ে আরো বেশি প্রাণ পেয়েছে। বড় কথা হচ্ছে সারা দেশে যেখানে সভা সমাবেশ এবং লোকসমাগম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেখানে ঘটা করে ইফতার পার্টি করা হয়। এটা হচ্ছে শহরতলী থেকে খুব কাছে একটি গ্রামের ঘটনা, আর সারা দেশে ৬৮ হাজার গ্রামে নিশ্চই এই অবস্থার ব্যতিক্রম হবে না। 

যেভাবেই হোক কিছু মানুষ তাদের জেলায়, থানায়, ইউনিয়নে কিছু মানুষ আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে যানবাহনগুলো বন্ধ থাকার ফলে, তা না হলে দেশে জগাখিচুরি কান্ড বেধে যেত। বগুড়ায় এক ঘটনা শুনে না হেসে পারা যায় না, এক মেয়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তে তার টেষ্ট করাতে দিয়েছে, তার পজেটিভ ধরা পরেছে, এখন পুলিশ গেল তার বাড়ীতে তাকে হসপিটাল নিয়ে যাবার জন্য, পুলিশ বাড়ীতে যেয়ে দেখে সে মেয়ে মার্কেটে গেছে ঈদের শপিং করার জন্য। পুলিশ তার মা কে বললো আপনার মেয়েকে তো নিয়ে যেতে হবে! তার মা উত্তর দিল, মেয়েটা মার্কেট থেকে ফিরে এলেই কাপড়-চোপড় দিয়ে আপনাদের সাথে পাঠিয়ে দিব। তার পরিবারের অবস্থা দেখে পুলিশদের কাপড় নষ্ট করে দেবার অবস্থা। এমতাবস্থায় সব কিছু খুলে দেয়া হলে ভাবা যায় আমাদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াবে! আমাদের মত দেশের সচেতনতার চেয়ে বেচে থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে। আটকে পরা শহরের মানুষগুলো গ্রামের দিকে দৌড়াবে, গ্রামের লোকদের বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরে পাড়ি জমাবে, এভাবে মায়ার বন্ধনে লেপ্টালেপ্টি হয়ে যাবে পুরো দেশে করোনা ভাইরাস। ছয়শো মৃত্যু হয়তো দেশের জন্য বড় ক্ষতি নয়, কিন্তু ছয়শো পরিবারের খুব বড় ধরনের ক্ষতির কারন হয়ে দারাবে। এভাবে ব্যক্তি থেকে পুরো দেশের করোনা পজেটিভ এলে সামাল দেবার উপায় খুঁজে পাবে তো? হয়তো প্রয়োজনেই সবাই বের হয়, কিন্তু করোনার ভাইরাস নিয়ে ঘরে ঢুকবে এটা কেউ চিন্তা করতে পারে না। আগামী অবস্থার প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ভাসমান, আমরা চিন্তা করছি সেদিকেই কি চলছে দেশ! যদি সেদিকেই ধাবিত হয় কি হবে আমাদের ভবিষ্যৎ, কিভাবে রুখবো করোনা নামক মহা দানবের আগ্রাসন। সেই প্রার্থনা দিয়ে আকাশের মালিকের দিকে চেয়ে থাকা, কি হবে আমাদের পরিণতি!

No comments: