The social page

Monday, May 11, 2020

লোক শিল্পীদের সামাজিক অবক্ষয়; প্রেক্ষিত- করোনা পরিস্থিতি


লোক শিল্পীদের সামাজিক অবক্ষয়; প্রেক্ষিত- করোনা পরিস্থিতি



গ্রাম বাংলায় যারা লোক কথা, লোক গাথা, লোক কাহিনী, লোক সুর, লোক কর্ম, লোক মানুষের জীবন চিত্র নিয়ে কাজ করে তারাই লোক শিল্পী। এর মধ্যে যারা লোক গান করে, লোক পালা যারা করে, লোক নাট্য যারা করে, লোক নৃত্য যারা করে, লোক আলেখ্য যারা করে, ঐতিহ্যবাহী যাত্রা যারা করে, লোক বাদ্য যারা বাজায় ইত্যাদি লোক শিল্পীর আওতাভুক্ত। এছাড়াও লোকজ সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত যারা আছে, তারাও লোক শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। তাদের জীবন ধারা খুবই সহজ সাধারন। তাদের মতে, ' সহজ খাই, সহজ থাকি, সহজ চলি, সহজ যাই, সহজ পুরো জীবনটাই।' তাদের জীবন ধারনের মধ্যে লোকজ শিল্প চর্চ্চার পাশাপাশি কেউ কেউ ক্ষেতে খামারে কাজ করে, কেউ চাষাবাদ করে, কেউ জেলে, কেউ তাতী, কেউ কুমার, কারো ছোট ব্যবসা আছে, কেউ রিক্সা চালায় ইত্যাদি। তারাই হচ্ছে মূল লোক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। উত্তরাধীকার পরম্পরায় ও গুরু পরম্পরায় তারা লোক সম্পদগুলো বহন করে, লালন করে এবং পালন করে। 

লোকজ সম্পদগুলো লোক শিল্পীদের প্রানের স্পন্দন। যে যে কাজই করুক না কেন দিন শেষে বাদ্য নিয়ে বসে একটু গুন গুন করবেই। নিজের মত গান বাধবে, কাহিনী বাধবে, নাচ তুলবে, নতুন পাঠ করবে ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে লোক শিল্পীদের কর্ম প্রদর্শন, চর্চা, শিক্ষাদান কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তির যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে, মিডিয়ার অত্যাধনিক প্রসারনায় শিল্পগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন লোকজ শিল্পের জায়গায় প্রাশ্চাত্য শিল্প জায়গা করে নিচ্ছে। তা'ই অনেক শিল্প বিলুপ্তিই প্রায়। যার ফলে যারা গুরু পরম্পরায় লোক শিল্প চর্চা করে আসছে তাদের মধ্যে অনেকে যুগের স্রোতে গাঁ ভাসিয়েছে, কেউ আদি শিল্প নিয়ে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে, কেউ বা বিলুপ্তির পথে।



লোক শিল্পীদের যারা যেখানেই আছে তারা খুব একটা ভালো নেই। তারা এই শিল্প গুলোর সাথে সম্পৃক্ত হবার পর থেকেই 
বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যারা উত্তরাধীকার পরম্পরায় চর্চা চালিয়ে তারা কিছুটা কম সামাজিক কটুক্তি গুলোর সম্মুখীন হয়, যারা গুরু পরম্পরায এ শিল্প চালিয়ে আসছে তারা মা-বাবার কাছে, বউয়ের কাছে শ্বশুরবাড়ীর লোকের কাছে, গুরুজনদের কাছে, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে রঙ-বেরঙের কথা শুনে শুনে শিল্প চর্চা চালিয়ে আসতে হয়। এই শিল্পের যে কি স্বাদ, কি মাহাত্ত্ব, কি অনুভূতি, কি মায়া, কি প্রেম, কি ভালোবাসা যারা চর্চা করে এবং যারা এর দর্শক, যাদের অমৃত আস্বাদনের ক্ষমতা আছে তারা এ শিল্পগুলির ক্বদর জানেন। সমাজে হরহামেশাই দেখা যায় কেউ যদি লোকজ পালা নাট্য গুলোর সাথে কাজ করে, এর জন্য কত যে কথার স্বীকার হতে হয়, তা বলা বাহুল্য, মায়ের কাছ থেকে শুরু হয়- 'কি সব করছ, ঘাটুদের মত সাইজা নাচ গান করছ, নাচনেওয়ালী সাজছস?', বাপের কাছে শুনতে হয়- 'ছেলে মানুষ কি মেয়ে সাইজা নাচে? আমি এক নর্তকী পালতাছি!', বউয়ের কাছে শুনতে হয়-' তুমি এরকম হাফলেডিস সাইজা নাচ, গান করো, মাইনসে দেখলে কি কয়?', বন্ধু বান্ধবের কাছে শুনতে হয়- 'কিরে মাইগ্গা আবার কবে ডেন্স মারবি?', মুরুব্বিদের কাছে শুনতে হয়- 'দোজখে যাইবি দোজখে, গান বাজনা নাটক কাজ হবে না!'। এরকম প্রত্যেকটা লোকজ শিল্পীর হাজার রকম কথা শুনে শুনে আসতে হয়।

এই শিল্প ভান্ডারের সারথীরা চলমান করোনা মহামারীতে কি অবস্থায় আছে,  সাধারন মানুষ কি তাদের খোজ নিচ্ছে? সমাজপতিরা কি তাদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে? এই স্বশিক্ষায় শিক্ষিত লোক শিল্পগোষ্টীদের প্রতি কি সমাজের সদয় দৃষ্টি আছে? থাকলে ভালো! এইশ্রেনীর মানুষ গুলাই আপনার, আমার বাপের নিজস্ব লোক সম্পদগুলো বহন করে বেরাচ্ছে। আর আমরা তো হাওলাত করা শিল্প নিয়ে লাফালাফি করে যাচ্ছি। এরা সমাজের নিগূঢ় ত্বত্তের দার্শনিক, এদের চোখেই সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিপীরণ, অত্যাচার, দোষ ধরা পরে, সেগুলীকে আবার সুন্দর করে উপমা দিয়ে শিল্প তৈরি করে।


লোক শিল্পীদের মধ্যে যারা বাদ্যযন্ত্র বাজায়, তাদের এটা বাজিয়েই সংসার চালায় বেশিরভাগ, অন্যান্য অনেক শিল্পীর আয়ের উৎস বাড়ি বাড়ি যেয়ে বাউল গান, বৈঠকি গান, বিচার গান, পালা গান, কবি গান, ঘাটু গান, ধামাইল গান, কিচ্ছা পালা, গম্ভীরা, আলকাপ, মাদারপীরের গান, সত্য পীরের গান, দত্ত গান, শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন, রামায়ন গান, মঙ্গরকাব্য, অষ্টক গান, জারি গান, কালীর নাচ, আদিবাসী নাচ, যাত্রাপালা ইত্যাদি করে জীবন যাপন করে। করোনার এই সঙ্কটময় অবস্থায় এই শিল্পীদের খোজ যদি কেউ না নেয়, তবে এ সম্প্রদায় কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে কিছু মেয়ে বাউল গান, যাত্রাপালা বিভিন্ন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত আছে, যারা এটা করে পরিবারকে কিছু সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মানুষ এই শিল্পীগুলোকে বাজারী মেয়ে হিসেবেই জানে। এখনও একটা প্রথা দেখা যায়, বিয়ের পাত্রী যদি গান, নাচ, নাটকের শিল্পী হয় তবে তাকে একহাড়ী হাজারটা কথা শুনতে হবে, সর্বশেষে একটা বাজারে মেয়ে হিসেবে পরিগনিত করবে।

এই মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে লোক সম্পদগুলোকে যদি টিকিয়ে রাখা না যায়,  তবে পরবর্তীতে লোক শিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে, শিল্পীদের জীবন হয়ে উঠবে অনিরাপদ। শহর এলাকার কিছু সচ্ছল শিল্পী থাকলে গ্রামের দিকে পুরোটাই বিপরীত। প্রত্যেক থানা শহরে এখন কিছু সংখ্যক লোক শিল্পী সমাজ খুজে পাওয়া যাবে। মহাজনরা যদি সদয় দৃষ্টি দেন এই ক্ষুদ্র লোক গোষ্টীর দিকে, তাহলে করোনা পরবর্তী সময়ে লোক শিল্প আবার খুজে পাবে তরুন প্রান। বেচে থাকবে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী লোক শিল্প।

1 comment:

Anonymous said...

মতামত দিন