The social page

Friday, May 08, 2020

করোনার সংস্পর্শে দারিদ্র ভারে নুইয়ে পড়েছে নিম্নবিত্তের মেরুদন্ড


করোনার সংস্পর্শে দারিদ্র ভারে নুইয়ে পড়েছে নিম্নবৃত্তের মেরুদন্ড 



চলমান দিন যাপনায় কাক ডাকা ভোরের শিহরিত হাওয়ায় গা ভিজিয়ে, আড়াই তারার সুখ বিসর্জন দিয়ে, কাঠপোড়া কয়লার ঘর্ষনে পাটি জোড়াকে খিস্তি দিয়ে টিউবওয়েলের ঐসর্গিক নির্ভেজাল জলে স্নাতো হয়ে রোজকার কাজের জন্য তৈরি হয় নিম্নবিত্ত শ্রেনীর নিরীহ মানুষ গুলি। দিন কয়েক পেয়াজডলা পান্তা কপালে জুটলেও আর্ধেক দিন দুই গ্লাস জলের উপরেই শুরু করতে হয়। মুসুরের ডাল আলু সেদ্ধোর স্পেশাল রেসিপি যেনো মোঘল আমলের মোরগ পোলাও আর কাচ্চিকেও হার মানায়। সারা দিনের পরিশ্রান্ত দেহে যা খায় মেশিনের মতো নিমেশেই হজম হয়ে যায়। উচ্চবিত্তের গ্যাষ্ট্রিক আলসার যেন ছুতেই পারে না। সারাদিন হাড়হাবাতে খাটনীর পর ঘর্মাক্ত দেহে বাড়ী ফেরে। যদি সময় হয় একটু চা'র দোকানের সিনেপ্লেক্সে বসে একটু সময় অতিবাহিত করে নিদ্রায় গমন করে। প্রায় একই সিডিউলে চলতে থাকে রোজকার দিনযাপন।

দিন চুক্তি হিসেবেই নিম্নবিত্ত শ্রেনীর কর্ম সম্পাদিত হয়। যেদিন আয় হয় তার পরের দিন মাছ ভাত জোটে, আর যেদিন কাজ বন্ধ তার পরের দিন জোটে কোন মত নূন ভাত। দিনকার রোজ অল্প আয়ের মাঝে কিছু অংশ যে সঞ্চয় করবে তা আর হয়ে ওঠে না। কিছু পরিবার বাৎসরিক একটা ভালো সময় পার করার জন্য মানে ঈদ বা যে কোন প্রয়োজনে সাপ্তাহিক কিস্তির ঋন নিয়ে থাকে। যার ঘানি টানতে টানতে বৎসর পার, তারপর আবারো সেই ঋনের পুঃনরাবৃত্তি, এসবের মাঝে আর নিজেদের সম্পদ বলে কোন সঞ্চয় হয়ে উঠে না। যা রোজগার হয় তাই দিয়ে আল্লার নাম বলে চলতে থাকে।

এমনি অবস্থায় মহামারী করোনার বিষাক্ত ছোবল পরে আমাদের দেশে। বিস্তার লাভ করতে থাকে আক্রান্ত রোগীর। সারা বিশ্ব প্রায় অচল অবস্থা, এরকই সাথে আমাদের দেশেও অচল হতে থাকে। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কলকারখানা, ব্যবসা-বানিজ্য, যানবাহনসহ সকল কিছু। তার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় নিম্নবিত্তদের আয়ও। অনেকে হয়তো ভেবেছিল সপ্তাহ খানেক পর সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু পরিস্থিতি আরো কঠিনের দিকে যেতে থাকে, ফুরোতে থাকে নিম্নবিত্তের হাড়ির ভাত, চারদিকে সুর বাজতে থাকে ক্ষুদার্থের হাহাকার। দারিদ্রের ঘন্টা যেন আরো জোরে বেজেই চলেছে। সবাই আটকে পরে ঘরে, চলতে থাকে ক্ষুদার্থের তারনা। বেলা বারতে থাকে আর অনাহারী পেটের আর্তনাতও বারতে থাকে। এভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে দিনগুলো আরো কঠিন হয়ে ওঠে বাড়তে থাকে বুক ফাটা কান্না।

করোনা মহামারীর দুঃসময়ে এগিয়ে আসে সরকার সহ অন্যান্য সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। ত্রান বিতরন চলে সাধারন মানুষের মধ্যে,  এর মাঝে কেউ পায় কেউ পায় না। তবে অনেক জায়গায় চেষ্টা ছিল সবার হাতে ত্রান পৌছে দেবার। ত্রান দেয়া হয়েছে সপ্তাহ পনের দিনে একবার তা'ও আবার ৫/১০ কেজি করে। এখন যে বিষয়টি উপলব্ধি করার বিষয় তা হচ্ছে, ৪/৫ জনের পরিবারে পাঁচ কেজি চাল, দুইকেজি আলু কয়দিন চলে? দৈনন্দিন ২/৩ বেলা হাজিরার পেটে খাদ্য না পরলে তো ইঞ্জিন ঠিক রাখা যাবে না। মহামারীর এই সময়টা যেন ডাক্তার রোগীর মত অবস্থায় পরিনত হয়েছে- রোগী ডাক্তারকে বললো স্যার আমার ঘুম হয়না আমি কি করতে পারি? ডাক্তার বলল, কিছু বড়ি দিলাম এগুলো খেয়ে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়বেন। যথারীতি রোগী ওষুধ খেল, যা ঘটলো, ওষুধ খেয়ে রোগী সারারাত বসে রইলো, রোগীর বউ গভীর রাতে স্বামী ঘুমাচ্ছেনা দেখে জিজ্ঞেস করলো, কি'গো ঘুমাচ্ছো না কেন? রোগী উত্তর দিল ডাক্তার বলেছে সকাল সকাল ঘুমাতে, তাই সকালে ঘুমানোর জন্য বসে আছি। লকডাউনে নিম্নবিত্তদের অবস্থা হয়েছে রোগীর মত, ঘরে বসে আছে কবে সকাল হবে কেউ জানে না। এদিকে পেট তো আর খালি থাকতে চায় না! 

কাজ না পেয়ে সবাই ছুটে এক পুটলা ত্রানের খোজো ত্রান বিতরনের সম্ভাব্য লোকদের দ্বারপ্রান্তে। কেউ এককেজি চাল, কেউ আধাকেজি আলু, কেউ একপোয়া পেয়াজ দিলে তা'ই দিনে খেয়ে না খেয়ে দিন চলতে থাকে। সরকারী যে চাল ত্রান হিসেবে পাওয়া যায়, সেটা নেয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিনিধির কাছে জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নাম্বার লিখে দিতে বলা হয়েছে। অনেকের মোবাইল থাকলে তো নাম্বার দেয়া যায়। এখন কথা হচ্ছে ফটোকপি করবে দোকান ছিল বন্ধ, নাম্বার লিখে দিতে হবে, আবার কার কাছে জমা দিবে এটাও অনেকে জানে না, হয়েছে বিপদ। এর মাঝে অনেক জায়গায় অল্পদামে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দেয়া শুরু করেছে, তাও আবার একগ্রাম থেকে আরেক গ্রাম পর্যন্ত লাইন। লাইনে জায়গা রাখার জন্য অনেকে ফজরের আযান দেয়ার সাথে সাথে লাইনে গিয়ে হাজির, গাড়ি আসবে সকাল নয়টার পরে। দীর্ঘ ছয় সাত ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে তারপরে যদি কাঙ্খিত অল্প মূল্যের জিনিস পাওয়া যায়। কয়েক জায়গায় লোক কমও হয়েছে।

এভাবে করোনা আক্রান্ত মহামারীর দিনগুলিতে নিম্নবিত্ত মানুষের সংসারের মেরুদন্ড ভঙ্গুর প্রায় অবস্থা। মহামারী কেটে যাবে,  মানুষের স্বাভাবিক দিন ফিরে আসবে, সবকিছু আগের মত চলবে, কিন্তু নিম্নবিত্তের সংসার আগের মত টিকে থাকবে তো! সমাজের মানুষেরা এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকবে তো! এভাবে চলছে অনাহারী মানুষের দিন গুনার পালা, কবে থামবে কেউ জানেনা, সবাই তাকিয়ে ওই আকাশের পানে!

No comments: