The social page

Saturday, May 09, 2020

মহামারী করোনার কড়াল গ্রাসে মধ্যবিত্তের দিনসমাচার


মহামারী করোনার কড়াল গ্রাসে মধ্যবিত্তের দিনসমাচার 



মুখে হাসি, শান্তি প্রিয়বাসী,
মধ্যবিত্তের এই রূপ বড় সর্বনাশী
না পায় তাদের কুলকিনারা
অল্পতে হয় সপ্নহারা।
পকেটে পাঁচ টাকার দুইটি নোট নিয়ে বুকে হাজারটা সপ্ন নিয়ে বাঁচার নামই মধ্যবিত্ত। যেখানেই ছুটে যাক না কেন, অর্ধেকটা পায়ে হেটে এসে বাকি পথটা পাঁচ টাকা দিয়ে অটো ভাড়া দিয়ে বাড়ী পৌছাবে। নিজের রিক্সাভাড়া বাচিয়ে ছেলের টিফিনের টাকা দেওয়ার নাম মধ্যবিত্ত, মুখে হাসি নিয়ে বুকে কষ্ট নিয়ে ভালো আছি বলার নাম মধ্যবিত্ত। হাজার টাকার শার্ট দুইশত টাকা দিয়ে ফুটপাত থেকে চকচকে শার্ট কিনে পড়ার নাম মধ্যবিত্ত। ছেড়া জুতা বার বার সেলাই করে পড়ার নাম মধ্যবিত্ত। এ মাল গুলো সবার থেকে আলাদা হয়। এদেরকে উচ্চবিত্তদের সাথেও চলতে হয় আবার নিম্নবিত্তদের সাথেও তাল মিলিয়ে চলতে হয়। 

মধ্যবিত্ত পরিবারের এরা ক্রিয়েটিভ অভিনেতা হয়ে থাকে। নিজেদেরকে অন্য মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করে। এদের মুখের রসই থাকে অন্যরকম, কেউ যদি বলে কি খেয়েছেন? এমন ভাবে বলবে যেন সাড়ে তিন তারা হোটেলের প্রথম শ্রেণীর খাবার খেয়ে এসেছে। খেয়েছে কিন্তু আলু ভাজি, ডিম ভাজি আর বাসীপান্তা ভাজা ভাত। এটাকে বলবে পটেটো ফ্রাই, ডিমের দু'পেয়াজার রেজালা, ফ্রাইড রাইস উইথ সস, সাথে রাজস্থানী সালাত। এভাবে বলতে শুনলে যে কারো জিভে জল চলে আসে। খাওয়ার চেয়ে বলায় বেশি রস থাকে এদের। ছেলে-মেয়ের স্কুল কলেজের বেতন দিতে হবে! এমন ভাবে টাকাটা কারো কাছ থেকে যোগার করবে, কাউকে বুঝতেই দিবেনা টাকাটা কোথায় থেকে জোগার করা হয়েছে। ছেলেমেয়ের জন্য টাকা পাঠানোর দরকার হলে নিজের জমি, প্রয়োজনীয় জিনিস বন্ধক রেখেও তবু টাকা পাঠাতে হয়। নিজের সিগারেট খাওয়ার টাকা বাচিয়ে ছেলের হাত খরচের টাকা দিতে হয় এই শ্রেনীর মানুষের। ঘরের একবেলার চাল বাচানোর জন্য প্রায়ই বলতে শোনা যায় বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি, পেট ভরা। এ পরিবারের মায়েদেরই বলতে শোনা যায়, আমি খেয়েছি তোমরা খেয়ে নাও।


হাজার রকম কষ্ট আর হরেক রকম কান্না নিয়ে বেচে থাকতে হয় এই মধ্যবিত্তদের। মহামারী করোনা এই বাংলায় খুটি স্থাপনের ফলে লাক্ষে লাক্ষে মধ্যবিত্তের শুরু হয় বুক ফাটা কান্না। নিম্নবিত্তের মত এরা ত্রানের জন্য দ্বারে দ্বারে দৌড়াতেও পারে না, কারো কাছে হাত'ও পাততে পারে না। সমাজের পরিক্ষীত শুদ্ধ জীব এরা। সরকারী বেসরকারী ছোট চাকরী অথবা ছোট মাঝারি ব্যবসা দিয়ে তাদের সংসার চলে। মোট আয়ের বেশিরভাগ অংশই যায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও মানুষ করার পিছনে। যে ছোট খাটো একটা সঞ্চয় করার সুযোগ হয় তা'ও আবার ছেলেমেয়ের পিছনে খরচ করতে হয়। 

শুরু হয় করোনার মহা প্রলয়, ধীরে ধীরে দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে,  ঘরমুখো হতে থাকে মানুষ, মধ্যবিত্তের গলায় পরে রশি। বাইরে বের হতে পারেনা করোনা পরিস্থিতির জন্য, আবার ঘরের খাবার ফুরিয়ে গেছে ঘরেও থাকতে পারছে না। ঘরের জমানো যা ছিল সেগুলো শেষ দিকে। সরকার মধ্যবিত্তদের দিকে তাকিয়ে অল্প মূল্যের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দেবার ব্যবস্থা করেছে, তা'ও আবার কয়েকটা এলাকার জন্য একটি পয়েন্টে। এই পণ্য গুলো নেবার জন্য এতো বড় লাইন হয় যে, রেললাইনের মত চোখ যতদুর যায় ততবড় লাইন। এ লাইনে দাড়িয়ে থেকে বাবা যখন রেশনের মোটা চাল, পেয়াজ, আলু, মোটা ডাল নিয়ে বাসায় আসে, তখন বাবাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাবা কোথায় গিয়েছিলে? বাবা তখন চট করে হাসি মুখে একটা মস্তবড় মিথ্যা কথা বলে ফেলে, বলে একটু ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়েছিলাম ব্যাংকে অনেক বড় লাইন, পরে টাকা তুলে বাজার করতে একটু দেরি হয়ে গেল। অথচ ব্যাংকের জমানো টাকা দুইমাস আগেই শেষ।

মধ্যবিত্তের মানুষেরা খুনি প্রকৃতির হয়, এরা পরিবারের সবার সপ্নকে প্রতিরাতে গলা টিপে হত্যা করে। প্রথমে সপ্ন ভাঙ্গে বিয়ে করা বউয়ের। একটা মেয়ের কত সপ্ন থাকে,  স্বামীর সাথে কত জায়গায় বেরাতে যাবে, ঘরে কত দামি-দামি আসবাবপত্র থাকবে, সােনাগয়না থাকবে, চারপাঁচটা দাসি-বাদি থাকবে আরো কত কি! বাস্তবে দেখা যায় পাতিলের তলা ঘষতে ঘষতে আর বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করতে করতে দাঁত পরা পাকা চুলের বুড়ি হয়ে যায়। বয়সকালে আর কোথায় যাবে ঘুরতে! ডাক্তারের কাছে আসতে যেতেই এক পা কবরে চলে যায়। ছেলে মেয়ের সপ্ন হত্যা করে এরা, ছোট বেলা শুনে আসে ছেলেমেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে, বাস্তবে দেখা যায় টাকার জন্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সাহসই করতে চায় না বাবা মা। ফলে ছেলেও সেই মধ্যমেই থেকে যায়।

মধ্যবিত্ত পরিবারের এরা পৃথিবীর আসল রূপ দেখতে পায়, মহামারী করোনার বিস্তারের ফলে একমাত্র এরাই না খেয়ে পেট ফাটানোর সাক্ষী হয়ে থাকবে। কষ্ট যে কি ভারী তা একমাত্র এরাই উপলব্ধি করতে পারে। কত রঙের কষ্টের চাদর গায়ে দিয়ে করোনা পরিস্থিতি পার করছে, তা তাদের ভিতরটা খুলে দেখলে তা বুঝা যেত। নিজের ডায়বেটিস আর উচ্চরক্তচাপের ওষুদের টাকা দিয়ে বাজার সদাই করতে, পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। পরিবারকে বাচানোর জন্য নিজের খবরটাই আর রাখা হয় না, সময় হয়না নিজেকে নিয়ে ভাবার। এই মহামারিতে কতটা কষ্ট শিকার করতে হচ্ছে তা দেখতে যাবে কে! উপর দিয়ে তো ভদ্রলোককে সুখিই দেখা যায়। এ করোনাময় পরিস্থিতিতে এখন দেখার বিষয় এই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা কতটুকু যুদ্ধ করে টিকিয়ে রাখতে পারে নিজেদের, বাচিয়ে তুলতে পারে তাদের পরিবারকে, সেই আশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, আকাশের মালিক কোথায় নিয়ে পৌছায় এই মধ্যবিত্তদের!

No comments: